ঈদের আগের রাত

মৃত্যুঞ্জয় রায়

টুয়েন্টি ডাউন লোকাল ট্রেনটা সেদিন বিষ্টুপুর ইস্টিশনে পৌঁছতে মাঝরাত পেরিয়ে গেল। বিকেল থেকেই দুর্যোগ শুরু হয়েছে। কালবৈশাখীর প্রচন্ড ঝড়ে প্রকৃতি যেন প্রলয় নাচ নাচছে। দুদ্দাড় ভেঙ্গে পড়ছে গাছপালা। রেল লাইনের দুপাশে লাগানো ইউক্যালিপটাস আর আকাশমণির ডাল ভাঙছে মটামট। ট্রেনটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু ঝড় আর থামেনা। অবশেষে আস্তে আসে- চলতে শুরু করলো। জোর বাতাসে রেললাইনের ফাঁক থেকে পাথর উড়ে যায় আর কি! ঝড়ের সাথে বৃষ্টি। বৃষ্টির ছাটে কিছুই দেখা যায় না। ট্রেনের ময়লা কাঁচের জানালা বৃষ্টির পানিতে ভিজে আরও ঘোলাটে হয়ে গেছে। আকাশেও জমাট কালো মেঘ। কড়কড় বাজের আওয়াজ আর ফ্লাশ লাইটের মতো তীব্র আলো মাঝে মাঝে এসে পড়ছে ট্রেনের জানালার কাঁচে। রেলগাড়ির ভেতর টিমটিম করে জ্বলছে বাতিগুলো। সে আলোয় অন্তর ব্যাগ থেকে একটা ভুতের বই বের করে খানিকটা পড়বার চেষ্টা করলো। কিন্তু সবই বৃথা। খুবই কম আলো। কিছুই পড়া যায়না। কিছুক্ষণ বইয়ের পাতা ওল্টালো অন্তর। না বইয়ের পাতায় আঁকা ভুতের ছবিগুলো যেন নড়ছে। পাতা থেকে উঠে ভুতগুলো হাঁটাহাঁটি করতে চাইছে। কিশোর অন্তর বইটা বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলো, যা শালার ভুতেরা। এবার ব্যাগে বন্দী হয়ে থাক।

কিশোর অন্তর আর ওর বাবা চলেছে ঈদ কাটাতে ওদের গ্রামের বাড়ি কাগমারী গাঁয়ে। ওখানেই এবার ঈদ করবে ওরা। ওর মা আসেনি। সকালে ঢাকার বাসা থেকে বেরোনোর সময়ও কত্ত রোদ। কিন্তু বিকেল ঘুরতেই সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল- খালি ঝড় আর বৃষ্টি। অন্তর ওর বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আর কতক্ষণ লাগবে বাবা কাগমারী পৌঁছতে?’
‘এতক্ষণ তো বিষ্টুপুর ইস্টিশনে পৌঁছে যাওয়ার কথা। ওখান থেকে তোমার দাদা বাড়ি আরও ঘণ্টা চারেকের পথ। কিন্তু এখন ঠিক বুঝতে পারছি না কখন পৌঁছব।’

বিষ্টুপুর ইস্টিশনে যখন ট্রেনটা এসে থামলো তখন রাত দুটো দশ। ঝড় বৃষ্টি তখনো থামার লক্ষণ নেই। বৃষ্টি হয়েই চলেছে, যেন আষাঢ় মাস। কিন্তু কি আর করা। ট্রেন থেকে না নামলে ট্রেন ছেড়ে দেবে। অগত্যা ওই বৃষ্টির মধ্যেই অন্তরও ওর বাবার সাথে নেমে পড়লো বিষ্টুপুর ইস্টিশনে। ট্রেন থেকে নামলো মাত্র ওরা দুজন। না-না, একটু পরে ট্রেনটা ঠিক ছাড়ার সময় নামলো আরও একজন। Golpo_EiderAgerRat2ইয়া জোব্বা টাইপের রেইনকোট পড়ে লোকটা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে খুব ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে। মাথায় একটা কাউবয় হ্যাট। বিদ্যুতের চমকে মাঝেমাঝে লোকটাকে একটু আধটু দেখা যাচ্ছে। অন্তররা ততক্ষণে স্টেশন মাস্টারের ছোট্ট কামরাটার ভেতর এসে দাঁড়িয়েছে। টিনের চালে ঝমাঝম বৃষ্টি হচ্ছে। ওয়েটিং রুম একটা আছে, ওটার চাল ভাঙ্গা, নোংরা। তাই ওখানে বসা অসম্ভব। স্টেশন মাস্টারের একটা ভাঙ্গা টেবিল আর একটা চেয়ার, টেবিলের উপর কাগজের স্তুপ। টেবিলের উপর একটা হ্যারিকেন জ্বলছে টিমটিম করে। চেয়ারটায় হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে স্টেশন মাস্টার। ট্রেন থেকে নেমে এই রুম পর্যন্ত আসতেই ওরা বেশ ভিজে গেছে। রাত না পোহানো পর্যন্ত কাগমারী গাঁয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। রুমে বসবার মতো কোনো জায়গা নেই। তাই অন্তরের বাবা কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে তার উপরেই ওকে বসতে বললো। এসব করতে করতে কখন যে রেইনকোট পরা লোকটা রুমের ভেতর ঢুকে পড়েছে অন্তরের বাবা সেটা খেয়াল করেনি।
‘কাগমারী যাবেন বুঝি?’
‘জ্বী। কিন্তু আপনি জানলেন কেমন করে?’
হা হা করে হেসে উঠলো রেইনকোট পরা লোকটা।
‘কাগমারী তো অনেক দূরের পথ। কিসে যাবেন? ঘোড়ায় চড়ে? না ভ্যানগাড়িতে? অবশ্য আজ যে বৃষ্টি হয়েছে তাতে ভ্যানগাড়ি চলে কিনা কে জানে? রাস্তাঘাট সব পানি কাদায় একাকার হয়ে আছে। এখন কিছু পাবেন না। তাই ও গাঁয়ে আর এখন আপনাদের যাওয়া হবে না। রফিক সাহেব নিশ্চই আপনাদের অপেক্ষায় সারা রাত জেগে বসে থাকবেন।’
রফিকউদ্দিন অন্তরের দাদাজানের নাম। লোকটা তাহলে ওদের চেনে!
‘আপনি দেখছি আমার বাবাকে চেনেন। আমাকেও চেনেন নাকি?’
প্রায় অন্ধকার ঘরটার ভেতরেও একটা অট্টহাসির শব্দ শোনা গেলো।
‘ চিনবো না কেন। ভীষণ খারাপ লোক। আচ্ছা রায়হান সাহেব, আপনি কি আপনার বাবাকে চেনেন?’
অন্তর ভেজা কাপড়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে। শীত শীত করছে। লোকটার কথা শুনে অন্তরের বাবার বড্ড রাগ হলো। কেউ নিজের বাবার বদনাম শুনতে চায়না।
‘লোকটা একদম বদমাইশ নম্বর ওয়ান। ফার্স্টক্লাস চিটিংবাজ। খুনি। জলজ্যান্ত একটা মানুষকে গলা টিপে মারতে তার একটুও হাত কাঁপে না। আচ্ছা, আপনি কি আপনার বাবাকে কখনো কোন মানুষ মারতে দেখেছেন? আপনার বাবা যে একজন ঠাণ্ডা মাথার খুনি সেইটা কি আপনি জানেন?’
অন্তরের বাবা খুব বিরক্ত হলো লোকটার কথা শুনে। ইচ্ছে হলো লোকটার গালে একটা কষে চড় বসিয়ে দিতে।
‘কি আবোল তাবোল বকছেন? এরকম বাজে কথা প্লিজ আর বলবেন না।’ রাগটা খুব চেপে গেলো সে।
মনে মনে ভাবলো, লোকটা নিশ্চই পাগল কিসিমের, মাথায় ছিট আছে। রাত ভোর না হওয়া পর্যন্ত লোকটা যদি এভাবে বকবক করতে থাকে তাহলে এরপর না জানি কি হয়। কিন্তু এখান থেকে বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। লোকটাও যেতে পারবে না। তাই সাই সুই না দিয়ে চুপচাপ থাকাটাই ভালো। লোকটা যা ইচ্ছে বলে যাক। এমন সময় স্টেশন মাস্টার চেয়ারে বসেই একটা লম্বা হাই তুলে বললেন, ‘দেখুন, আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে। ভোর থাকতেই আবার জাগতে হবে আপ ট্রেনটাকে পার করাতে। তাই আপনারা যে যেখানে যাওয়ার দয়া করে কেট পড়ুন তো। আমি এখন দরজাটা বন্ধ করে ঘুমুবো।’
‘বলেন কি? এই বৃষ্টি মাথায় দুর্যোগের মধ্যে আমরা কোথায় যাব?’
‘তার আমি কি জানি?’

স্টেশন মাস্টার কথাটা বলতে বলতে হ্যারিকেনটা হাতে করে ওদের কাছে উঠে এলেন। হ্যারিকেনের আলোয় অন্তরের বাবা লোকটার মুখ এক পলক দেখে চমকে উঠলো। চোখ দুটো টকটকে লাল জবা ফুলের মতো। চোখের মনি আছে কিনা ঠাহর করা গেলো না। ঘরের ভেতর রেইনকোট বা হ্যাটের কোনো দরকার নেই। তবু লোকটা গা থেকে ওগুলো খুলছে না। কাঁধ ঝাকিয়ে জোরে হেসে উঠলো লোকটা, ‘হোটেল ফোটেল কিচ্ছু পাবেন না এই বিষ্টুপুরে। তার চেয়ে চলুন পাশেই একটা চায়ের দোকানের ছাপড়া আছে। একটা বেঞ্চিও পাতা আছে ঝাপের নিচে। দোকান বন্ধ চুলায় গরম কয়লাও থাকতে পারে। হাত-পা সেঁকে নিতে পারবেন।’
কোন কিছু ভাবার কোন ফুসরতই দিলো না স্টেশন মাস্টার। একরকম ঠেলেই ওদের ঘর থেকে বের করে দিলো সে। রেইনকোট পরা লোকটা যেখানে দাঁড়িয়েছিলো সেখান থেকে কয়েক পা সরে যেতেই হ্যারিকেনের আলোয় মেঝেতে সে জায়গাটা দেখেই চমকে উঠলো অন্তর আর ওর বাবা। তাজা রক্তের দাগ। লোকটা পিছু ফিরে তাকিয়ে ওদের ভয় ভাঙালো, ‘ও কিছুনা। বোধ হয় ধাউস একটা জোঁক লেগেছিলো পায়ে। টের পাইনি। খুব রক্ত চুষে নিয়েছে। অজান্তে কখন অন্য পায়ের ডলা খেয়ে পিষে গেছে টের পাইনি।’
ওরা বেরিয়ে যেতেই স্টেশন মাস্টার দরাম করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো।
‘আপনার পিতা যে খারাপ এইটা আপনি জানেন না?’
‘না।’ অন্তরের বাবার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। জমাট অন্ধকার, তবে বৃষ্টিটা পড়ছে হালকা ঝিরি ঝিরি। গায়ে লাগেনা। তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে কথা হচ্ছে। স্টেশনের একেবারে উত্তর মাথায় গিয়ে ওরা একটু ডান দিকে মোড় নিলো। নীচে কাদায় পা পড়তেই ফ্যাচাৎ করে একটা শব্দ হলো। অস্পষ্টভাবে একটা ছাপড়ার নীচে বেঞ্চিটা দেখা গেলো। বেঞ্চিটার কাছাকাছি পৌঁছতেই লোকটা রেইনকোটের পকেট থেকে ম্যাচ বের করে একটা সিগ্রেট ধরালো। সে আলোতেই ওরা একটা ভেজা বেঞ্চকে এবার দেখতে পেলো। সেই সাথে দেশলাইয়ের আলোয় লোকটার মুখটা আবার দেখা গেলো। হ্যাঁ, ঠিকই ওর চোখটা টকটকে লাল, রক্তের মতো। শ্যামলা ভাঙাচোরা একটা মুখ, কপালে বড় একটা কাটা দাগ, একজোড়া গোঁফ, চওড়া মোটা ঠোঁট।
‘জানি, আমার কথা আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু খোদার কসম, সত্যই আপনার পিতা একজন চরম খারাপ লোক, খুনি। ধুন্ধুমার গিরিংগিবাজ।’
‘আঃ, থামুন তো।’ অন্তরের বাবা একটু মৃদু প্রতিবাদ করলো লোকটার কথায়। কিন্তু লোকটার তাতে কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেলো না। সে তার কথা বলেই যেতে থাকলো, ‘কিশওয়ারকে চেনেন? এক অভাগা যুবকের নাম। আপনার পিতা তাকে সিঙ্গাপুর পাঠাতে চেয়েছিলেন। সেই লোভে একদিন কিশওয়ার ওদের সব সম্পত্তি বেচে চার লাখ টাকা আপনার পিতার হাতে তুলে দিয়েছিলো। কত আর? বছরখানেক আগের হবে। কিন্তু আপনার পিতা তাকে সিঙ্গাপুর পাঠাতে পারেনি। অবশেষে কিশওয়ার একদিন তার পাওনা টাকা ফেরত চাইলো আপনার পিতার কাছে।’
‘আপনি ভুল করছেন। আমার পিতা কখনোই আদম ব্যাপারী ছিলো না। আপনি হয়তো অন্য কোন রফিক সাহেবের কথা বলছেন।’
থিক থিক করে একটা পিশাচে হাসি বেরিয়ে এলো লোকটার মুখ থেকে। শব্দটা শোনা গেলো বড় বিচ্ছিরি করে।

‘মাসের পর মাস ঘুরে টাকা না পেয়ে শেষে কিশওয়ার একদিন খুব রেগে যাচ্ছেতাই গালাগাল করলো আপনার পিতাকে। অবশেষে রফিক সাহেব কিশওয়ারকে টিকিট আর ভিসা নেয়ার জন্য ডেট দিলেন। ঢাকা থেকে নাকি ওসব নিয়ে একজন লোক আসবে বিস্টুপুর ইস্টিশনে। তাই কিশওয়ারকে তিনি ইস্টিশনেই আসতে বললেন। দিনটা ছিলো গত পরশু। সেদিনও ট্রেনটা খুব লেট ছিলো। রফিক সাহেব সত্যি সত্যিই এসেছিলেন। রাত বাড়ছিলো। কিশওয়ার বিদেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ট্রেনটার অপেক্ষা করছিলো- একজন মানুষ আসবে। তার হাতে থাকবে কিশওয়ারের প্লেনের টিকিট, পাসপোর্ট ভিসা এনওসি ইত্যাদি ইত্যাদি। সে স্বপ্নের দেশ সিঙ্গাপুরে যাবে চাকরি করতে। সেদিন কোন বৃষ্টি ছিলো না, তবে রাতটা ছিলো অমাবস্যার। রাত বাড়ার সাথে সাথে ইস্টিশন ফাঁকা হয়ে যায়। কোন মানুষ ছিলো না। রোজকার মতো স্টেশন মাস্টার ছিলো তার ঘরে। কিন্তু ট্রেন আর আসে না। স্টেশন থেকে একটু দূরে রেললাইনের উপর পা দুলিয়ে বসে দুজন ট্রেনের অপেক্ষায় চেয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ কি হলো জানেন?’
‘কি?’ কথাগুলো শুনে আড়ষ্ট হয়ে আসছে অন্তরের বাবার হাত পা।
‘হঠাৎ রফিক সাহেব কিশওয়ারের গলা টিপে ধরলেন। অদ্ভুত কায়দা জানেন লোকটা। একেবারে হাতপাকা। নিমেষেই রেললাইনের উপর লুটিয়ে পড়লো কিশওয়ারের মৃতদেহ। রফিক সাহেব হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়াতেই টুয়েন্টি ডাউন লোকালটা বিষ্টুপুর ইস্টিশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকলো। তারই ধীরে চলা চাকায় দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেলো কিশওয়ারের মৃতদেহটা। রফিক সাহেব সেদিন একটা সাদা ঘোড়ায় চড়ে ইস্টিশনে এসেছিলেন। সেই ঘোড়ায় চড়েই শান্তভাবে আবার ফিরেও গেলেন কাগমারী। কিন্তু সবাই জানলো, কিশওয়ার ট্রেনের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে।’
অন্তরের বাবার এসব কথা শুনে খুব ঘাম হচ্ছে শরীরে, মাথাটার মধ্যে জোর চক্কর দিচ্ছে। লোকটা যা বলছে তা যদি আসলেই সত্যি হয়! বেঞ্চিতে পাশে বসে অন্তর ওর কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঝড় থেমে গেছে। দূরের কোনো মসজিদ থেকে আযান হচ্ছে। চারদিক একটু একটু করে ফর্সা হতে শুরু করেছে। পূবের আকাশটা লালচে হয়ে উঠেছে। ঝড়ে ভাঙ্গা ডালপালা এদিক ওদিক ছিটিয়ে পড়ে আছে। সকাল হলেই ঈদ। লোকটার মুখের দিকে অপলক চেয়ে রইলো অন্তরের বাবা। শ্যামলা ভাঙাচোরা একটা মুখ, কপালে বড় একটা কাটা দাগ, একজোড়া গোঁফ, চওড়া মোটা ঠোঁট। সেই একই চেহারা।
‘জানি, এসব কথা আপনি বিশ্বাস করেননি। সত্যই তো। কোনো প্রমাণ ছাড়া কি কেউ এসব বিশ্বাস করে?’
‘নাহ্‌, বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্নের চেয়েও বড় যে, সত্যই যদি আমার পিতা রফিকউদ্দিন খুন করে থাকে তাহলে আপনি এতসব কথা জানলেন কেমন করে? আপনি কি তার কাছাকাছি কোথাও ছিলেন? তিনি কি কোনো স্বাক্ষী রেখে এ কাজ করেছেন?’
একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো লোকটা, ‘সত্যই তিনি কোনো স্বাক্ষী রেখে এ কাজ করেননি। আসল স্বাক্ষী তিনি নিজেই। তবে আমি যে কথাগুলো বললাম, তাকে জিজ্ঞেস করলেই আপনি সব জানতে পারবেন। তবে যাওয়ার আগে স্টেশন মাস্টারকেও একটু জিজ্ঞেস করে যেতে পারেন। তিনিই ভালো বলতে পারবেন যে পরশু রাতে আসলে ঘটনাটা ঘটেছিলো কিনা।’
মাথাটা ঝিমঝিম করছে, সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। ফর্সা হয়েছে কিছুটা। এবার অন্তরের বাবা স্পষ্ট দেখতে পেলো, লোকটার চোখে কোনো মনি নেই। চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। চোখ থেকে অশ্রুর মতো রক্ত ঝরছে। গালের দুপাশ বেয়ে সে রক্তের ধারা নামছে। হঠাৎ পা দুটোর দিকে তাকিয়ে ভয়ে চমকে ওঠে অন্তরের বাবা। পা দুটো থেতলানো, রক্ত ঝরছে। ভাঙ্গা হাড় বেরিয়ে রয়েছে। রেইনকোটের ফাঁক দিয়ে কমলা শার্টের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ওখানেও রক্ত। অন্তরের বাবার মাথাটা ঘুরে উঠলো। শরীর কাঁপছে।

লোকটা রেইন কোটের মধ্য থেকে দুটো হাত বের করে অন্তরের বাবার গলার কাছে ধরলো। কমলা রঙের শার্টের আস্তিন রক্তে ভিজে আরও কমলা হয়ে গেছে। এ কি! লোকটার হাত দুটো কংকালের মতো কাঠি কাঠি কেন?
Golpo_EiderAgerRat3 ‘এখন যদি আপনাকে আমি আপনার বাবার মতো গলা টিপে মেরে ফেলি, কেউ ঠেকাতে আসবে না। আপনি মরে যাবেন। আপনাকে গলাটিপে মারার জন্যই আমি এসেছিলাম। কিন্তু পরে ভাবলাম, তাহলে তো আপনার সত্য কথাগুলো জানা হবে না। আপনার বাবা যে সত্যই একজন খারাপ লোক সেটা জানা হবেনা। পৃথিবীতে যখন কোনো সন্তান জানতে পারে যে তার পিতা একজন খারাপ লোক তখন সেই সন্তানের যন্ত্রণার আর শেষ থাকে না। তাই ও কথা জানার পর শেষ জীবনটা প্রতি মুহূর্তে আপনি যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকবেন, ওটাও এক ধরনের মরা।’

ঝিম মেরে বসে রইলো অন্তরের বাবা। অন্তর তার কোলে মাথা রেখে ঘুমুচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সম্বিৎ ফিরে এলো। উঠতে হয়। কিন্তু ব্যাগটা গেলো কই? ব্যাগ নেই, লোকটাও হাওয়া। অন্তরের বাবার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, লোকটা এক মহা ধড়িবাজ। নানা ফন্দি ফিকির করে আর গল্প ফেঁদে ব্যাগটা হাতানোই ছিলো তার আসল উদ্দেশ্য। ব্যাগ গেছে যাক। তবু একটা কথা মনে মনে ভেবে শান্তি পেলো সে- গল্পটা নিশ্চই সত্যি নয়। অন্তরের বাবার মনটাকে দুর্বল করার জন্য ওর বাবাকে খুনি সাজিয়ে গল্পের প্লট সাজিয়েছিলো লোকটা। মনটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে ব্যাগটা হাতিয়ে কেটে পড়েছে। যাক, কি আর করা! এখন অন্তরকে নিয়ে তাড়াতাড়ি কাগমারী পৌঁছতে হবে- ঈদের নামাজ ধরতে হবে।
প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বেরোনোর সময় দেখলো স্টেশন মাস্টারের দরজাটা ফাঁক করা। তার মানে এত ভোরেই সে উঠে পড়েছেন। অন্তরের বাবা দরজাটা আর একটু ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে একটা গলা খাকারি দিলো।
‘কে?’
‘জ্বী আমরা। গতরাতের প্যাসেঞ্জার।’
‘ও। এখনো যাননি? ভ্যানগাড়ি পাননি বুঝি?’
‘না, মানে ঠিক তা নয়। আমি একটা কথা জানতে এসেছি।’
‘কি কথা?’
‘পরশু রাতে এই স্টেশনে এক যুবক কি ট্রেনে কাটা পড়েছে? তাকে চেনেন?’
‘জ্বী। তবে চিনিনা। নাম শুনেছি কিশওয়ার।’
অন্তরের বাবার মেরুদণ্ড বেয়ে যেন বরফের স্রোত নামছে। চোখ মুখ ঘামে ভিজে যাচ্ছে। তার মানে লোকটার কথা সত্যি।
‘কেমন চেহারা ছিলো ছেলেটার, বলতে পারবেন?’
‘শ্যামলা ভাঙাচোরা একটা মুখ, কপালে বড় একটা কাটা দাগ, একজোড়া গোঁফ, চওড়া মোটা ঠোঁট। কমলা রঙের একটা শার্ট পরা ছিলো। ট্রেনে কাটা পড়ে শরীরটা দুভাগ হয়ে পড়েছিলো। চেনন নাকি? কিছু হয় আপনার?’ পাল্টা প্রশ্ন করলেন স্টেশন মাস্টার।
‘না।’ বলে দ্রুত অন্তরকে নিয়ে স্টেশনের বাইরে চলে এলো সে। ভাবলো, স্টেশন মাস্টারের বর্ণনা মতো ওই চেহারার লোকটার সাথেই তো কাল রাতে ওর দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। তাহলে কি কিশওয়ার মরেনি? আহত হয়ে স্টেশনে ঘুরে বেড়াচ্ছ? তা কি করে হয়? স্টেশন মাস্টার বলছে সে মরে গেছে!’ একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করলো নিজেকে, ‘ট্রেনে কাটা পড়ে লোক তো মরতেই পারে। সেটা স্টেশনের লোকজন জানবে তাতে আর আশ্চর্য হওয়ার কি আছে? গতরাতের লোকটাও সে কথা জানে। গল্পটা বলে ওকে ঠকানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু যে কথা অন্য সবাই জানেনা তা হলো তার বাবা রফিকউদ্দিন লোকটাকে গলাটিপে মেরে রেল লাইনের উপর ফেলে রেখে চলে গেছে। ও কথা সে জানলো কি করে? এটাও নিছক গল্প।’

ততক্ষণে স্টেশন জেগে উঠেছে। দু একজন লোক আর ভ্যান আসতে শুরু করেছে। একটা ভ্যান নিয়ে ওরা রওনা হলো কাগমারীর পথে। রাস্তা ভীষণ খারাপ। পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা সাড়ে দশটা। নামাজ শেষে সবাই বাড়ি ফিরছে। বাড়ি পৌঁছে উঠোনেই দেখা হলে তার বাবা রফিকউদ্দিনের সাথে।
‘আইছস তরা? আইছস? কুনো বিপদ হয়নাই তো? সরাডা রাইত আমি ঘুমাইবার পারি নাই।’
অন্তরের বাবা সে কথার কোন জবাব না দিয়ে শুধু বললো, ‘আব্বা, আপনার সাথে কিছু কথা আছে।’
‘কথা পরে হবে। এক্ষুন গোসল সাইরা আগে নামাজডা পইড়া ল তো। সিমাই খাইয়া আগে একটু জিরায়া ল। পরে কত পারো কথা কইও।’
‘না, এখনই আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই। খুব জরুরি। চলো ও ঘরটায় যাই।’
অন্তর ততক্ষণে ওর দাদীজানকে পেয়ে মহাখুশিতে তার সাথে ভেতরে চলে গেছে। দুজন দুটো চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসলো। রফিকউদ্দিন চিন্তিত, কি বলে ছেলেটা কি জানি?
‘বাবা, আজ ঈদের দিন। আজ কোন মিথ্যা বলতে নেই। তুমি আমারে সত্য কথাগুলো বলবে।’
‘তর কি হইছে রে বাজান?’
অন্তরের বাবার চোখমুক্ত শক্ত, ‘কিশওয়ারকে চেনো তুমি?’
নামটা শুনেই যেনো আঁতকে উঠলেন রফিক সাহেব, ‘তুই চিনস নাকি?’
‘তার মানে ওকে চেনো তুমি।’
‘হ, চিনি। ক্যান কি হইছে?’
‘তার কাছ থেকে বিদেশে পাঠানোর নাম করে কত টাকা নিয়েছিলো?’
খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন রফিক সাহেব। কি বলবেন?
‘তরে ক্যাডা কইছে?’
‘যেইই বলুক। কথাটা কি সত্য?’

নিচের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়েন রফিক সাহেব, ‘ঈদের দিন তুই এ কি প্যাঁচাল শুরু করলি রে বাজান?’
‘কিশওয়ারকে তুমি বিদেশে পাঠাতে পারনি। তার টাকাটা যাতে আর ফেরত দেয়া না লাগে সেজন্য ঠাণ্ডা মাথায় তাকে খুন করেছ। বিষ্টুপুর স্টেশনে পরশু রাতে তাকে গলা টিপে মেরে রেল লাইনের উপর ফেলে রেখে চলে এসেছ। পরে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ওর মৃতদেহটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। লোকেরা জানে কিশওয়ার ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মরেছে। সেদিন ওর পরনে ছিলো কমলা রঙের এটা শার্ট। কথাগুলো কি সত্য?’
রফিকউদ্দিনের চোখ ছলছল করছে। মাথা নিচু করে ছেলের সামনে বসে আছেন। কোন উত্তর দিচ্ছেন না। অন্তরের বাবা আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘তার চেহারাটা কেমন ছিলো বলো তো।’
‘শ্যামলা ভাঙাচোরা একটা মুখ, কপালে বড় একটা কাটা দাগ, একজোড়া গোঁফ, চওড়া মোটা ঠোঁট।’
মুহূর্তের মধ্যে অন্তরের বাবার মাথাটা ঝিলিক দিয়ে ওঠে। কাল রাতে তো অবিকল ও রকম চেহারার একটা লোকের সাথেই সে কথা বলেছে। তাহলে কি ওই লোকটাই ছিলো কিশওয়ার? সত্যি কি সে মরেনি? নাকি ও ছিলো তার প্রেতাত্মা! একটা ভুতের সাথে তার কাল রাতটা কেটেছে!’ মনে পড়তেই গা-টা কাঁটা দিয়ে উঠলো, তবে লোকটা যাই হোক, সে বড় উপকার করেছে। না হলে হয়তো জানাই হতো না যে তার বাবা সত্যই একজন খারাপ লোক, খুব খারাপ।