ছায়াহীন

শিবব্রত বর্মন

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে চোর এসে এহতেশাম আখনজির ছায়া চুরি করে নিয়ে গেছে।
চোরের আর দোষ কী, সে এসে সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে নেবার মতো কিছুই পায়নি। সিঁদেল চোর। প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার অমানুষিক কষ্টে পৌনে সাত ফিট লম্বা একটি সিঁদ কেটে ঘরে ঢুকেছে, সেটা কি তার ভাত খাওয়ার টিনের থালা আর ওজু করার বদনাটা নেবার জন্য? সারা বাড়িতে হাতে তোলার মতো আর একটা জিনিসও কি থাকবে না? কৃপণ বলে এমনই কৃপণ! রাগে ব্রহ্মতালু গরম করে চোর ঘুমন্ত আখনজির ছায়াটা চুরি করে নিয়ে গেছে।
এর ফলাফল এই যে, এরপর থেকে এহতেশাম আখনজির আর ছায়া পড়ে না। ভরদুপুর, কী বিকেলে তিনি যখন রাস্তা হাঁটেন, তখন রোদের বিপরীত দিকে রাস্তার উপর তার কোনো ছায়া পড়ে না। ব্যাপারটা জেনে যাওয়ার পর প্রথমটায় আখনজি তেমন একটা উদ্বিগ্ন হননি। তিনি বরং কিছুটা ভারমুক্তই বোধ করেছিলেন। মানুষের ছায়া মানুষের তেমন তো কোনো উপকারে লাগে না। খামাখা বাড়তি একটা জিনিস বয়ে বেড়ানো। ভেবে দেখলে পৃথিবীতে প্রত্যেক ব্যক্তির, প্রত্যেক প্রাণীর এমনকি প্রত্যেক বস্তুর নিজস্ব একটা করে ছায়া আছে বটে, কিন্তু থাকতেই হবে এমন তো নয়। না থাকলে কী ক্ষতিবৃদ্ধি!

Golpo_Chayahin

ফলে ছায়াহীন দিনগুলো প্রথমটায় তার খুব ফুরফুরে মেজাজেই কেটেছে। ছায়া না থাকার উপকারিতা তিনি নানান জনকে বুঝিয়ে বেরিয়েছেন। তবে সেটা মাত্র ছয় দিনের জন্য। সাত দিনের মাথায় কেমন একটা অস্বস্তি ভর করতে শুরু করে আখনজির মনে। সেটা যে ঠিক কী, ব্যাখ্যা করা খুবই মুশকিল। ব্যাংকে না রেখে তোষকের নিচে পাঁচশ টাকার দশটা নোট রেখে ঘুমানোর উদ্যোগ নেয়ার মতো একটা অস্বস্তি। কিংবা ঠিক তাও না, একটা অপরিচিত লোক পিছু নিয়েছে বলে মনে হওয়ার পর অচেনা একটা শহরের রাস্তায় হাঁটতে যেমন লাগে, তেমন...না ঠিক তেমনও না। অন্ধকারে এমন একটা লিচু খাওয়ার মতো অনুভূতি, যেটার গোড়ার দিকে অন্তত দুটা সাদা পোকা আছে বলে মন খচখচ করতে থাকে। না, সেরকমও নয়। মোটা দাগে বুঝিয়ে বললে ব্যাপারটা কিছুটা এরকম দাঁড়ায় যে, ছায়া ছাড়া কেমন ফাঁকা ফাঁকা, একা একা বোধ করতে শুরু করলেন আখনজি। কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যেতে থাকলেন। দশম দিন থেকে তিনি বলতে শুরু করলেন, ছায়া ছাড়া দেহ আসলে অর্থহীন। আর এই ব্যাপারটা তিনি আগে বুঝে উঠতে পারেননি। আরো নানারকম দার্শনিক কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন তিনি, সেগুলো বোঝা খুব শক্ত। আখনজি কথা ভালো বুঝিয়েও বলতে পারেন না।
চতুর্দশ দিনে আখনজি অনুভব করতে শুরু করলেন, তার আসলে কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। চেনাজানা লোকেরাও সেই কথাই বললো। মফস্বল শহরে সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনের ডাক্তারের তো বালাই থাকে না। এহতেশামজি গেলেন দাঁতের ডাক্তার রাজিব আরসালানের কাছে, যাকে কমবয়সীরা আড়ালে ‘রাজিব দরদালান’ বলে ডাকে। চিকিৎসক হলেও সব বিষয়ে বিস্তর বইপত্র পড়ার বাতিক আছে আরসালানের। তার ঘরের চারপাশে দেয়ালভর্তি নানারকম বইপত্র। দাঁত দোলার বাইরে তিনি প্রায় সারাদিনই সেগুলোর মধ্যে ডুবে থাকেন। সে কারণেই সন্ধ্যার পর বড়বাজারে মোটা নিমগাছের নিচে তার একতলা চেম্বারে যাওয়া। তো, চেম্বারে মুখোমুখি বসে আখনজি আর ডাক্তার আরসালানের মধ্যে যেসব কথাবার্তা হলো তা অনেকটা এরকম :

ডাক্তার : আপনি বলছেন আপনার কোনো ছায়া পড়ে না?
আখনজি : না।
ডাক্তার : রোদের মধ্যে দাঁড়ালেও না?
আখনজি : না।
ডাক্তার : বাতির আলোয়?
আখনজি : তাও না। ইলেকট্রিক লাইট, বা মোমবাতির আলো, কোনোটাই না।
ডাক্তার : আচ্ছা দাঁড়ান তো এই দেয়ালটার সামনে, আমার চার ব্যাটারির চাইনিজ টর্চটা মেরে দেখি....আরে তাই তো! দেয়ালে তো কোনো ছায়াই পড়ছে না! ইন্টারেস্টিং।
আখনজি : আমি কি এমনি এমনি বলছি নাকি!
ডাক্তার : তা ছায়া না পড়লে নাই পড়লো, তাতে সমস্যাটা কী?
আখনজি : সমস্যাটা কী বোঝানো মুশকিল। আমার সারাক্ষণ কেমন ফাঁকাফাঁকা লাগে।
ডাক্তার : কেন?
আখনজি : ছেচল্লিশ বছর ধরে একটা জিনিস ছিল আমার সঙ্গে। দিন নেই রাত নেই, আমাকে নিঃস্বার্থভাবে সঙ্গ দিয়ে গেছে। এখন হুট করে সেটা নেই হয়ে যাবে, এটা হতে পারে!
ডাক্তার : তা তো বটেই। ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক।
আখনজি : শুধু সেটা হলেই কথা ছিল না, আরো সমস্যা আছে। ছায়া না থাকার কারণে কোনো দেহ না থাকলে যেরকম অস্বস্তি লাগে, সেরকম অস্বস্তি লাগছে আমার। নিজেকে কেমন অদৃশ্য অদৃশ্য লাগছে।
ডাক্তার : সেটা কেন?
আখনজি : আচ্ছা ভেবে দেখুন, একটা জিনিসের ছায়া কেন পড়ে? সায়েন্টিফিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করুন।
ডাক্তার : আলো বাধা পায় বলে ছায়া পড়ে। আপনার দেহ যতোটা অংশ জুড়ে, ততটা অংশের মধ্যে দিয়ে আলো যেতে পারে না। বাকি চারপাশ দিয়ে বাতাস ভেদ করে আলো চলে যায়। আর এ কারণে আপনার দেহের অবয়বের মাপে একটা ছায়া পড়ে আলোর উৎসের উল্টোদিকে।
আখনজি : এখন, আমার ছায়া পড়ছে না মানে হলো আমার দেহের ভিতর দিয়েও আলো চলে যাচ্ছে। যাচ্ছে কিনা বলুন?
ডাক্তার : যাচ্ছে।
আখনজি : মানে আমি স্বচ্ছ। বাতাস যেমন স্বচ্ছ, ঠিক তেমন। স্বচ্ছ হওয়ার মানে কিন্তু অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। বাতাস যেমন অদৃশ্য।
ডাক্তার : যুক্তিতে তো সেরকমই দাঁড়ায়।
আখনজি : এখন যে জিনিসটা স্বচ্ছ, মানে অদৃশ্য, মানে দেখা যায় না, সেই জিনিসটা আছে না নেই, সেটা নিয়ে সন্দেহ তৈরী হতেই পারে।
ডাক্তার : পারে তো।
আখনজি : মানে জিনিসটা যে আছে, এরকম পাকা, অকাট্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তো ধরেই নিতে হবে যে, নেই।
ডাক্তার : সেরকমই তো কথা।
আখনজি : তো সেই কারণেই, আমি আছি না নেই, এই ধন্দ কাটাতে পারছি না।

এরপর এহতেশাম আখনজি যেসব কথা বললেন, তাতে ডাক্তার রাজিব আরসালানের মাথা কেমন ঝিমঝিম করতে লাগলো। ওইদিন আরো চারজন রোগী বাইরে কাঠের চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছিল। দুজন প্রচণ্ড দাঁত ব্যাথায় কোঁকাচ্ছিল। বাকি দুজনের অর্ধেক রুট ক্যানাল করা হয়েছে। তিনি সবাইকে বিদায় করে দিয়ে গটগট করে বাসায় চলে গেলেন। বাসায় গিয়ে তিনি কালো চামড়ায় মোড়ানো একটা ঢাউস বই বের করে পড়তে শুরু করলেন। বইটার নাম “অ্যাপিয়ারেন্স অ্যান্ড রিয়ালিটি”। টানা চারদিন বইটা তিনবার পড়ার পর অবশেষে তিনি যখন বই বন্ধ করলেন, তখন টের Golpo_Chayahinপেলেন তার চোখের পাতা আর বন্ধ হচ্ছে না। পুরনো ট্রেনের বগির মরচে পড়া কব্জায় দরজা আটকে গেলে যেমন হয়, সেরকম তার চোখের পাতা আটকে গেছে। বিস্ফারিত চোখে নির্নিমেষে জগতের অ্যাপিয়ারেন্স এবং রিয়ালিটি বিরতিহীন দেখে যেতে বাধ্য হতে লাগলেন তিনি।
তবে ডাক্তার আরসালানের গল্প পরে বলা যাবে। আমরা আপাতত ছায়াবঞ্চিত এহতেশাম আখনজির পরিণতির দিকে মনোযোগ দেই।
ছায়া না থাকার কারণে নানারকম দার্শনিক প্রশ্ন আখনজির মাথায় উঁকি দিতে থাকলো। পাশাপাশি আরেকটা ব্যাপার ঘটলো তার মধ্যে। তিনি লক্ষ্য করলেন, তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে। এমন অনেক বিষয় তিনি এখন লক্ষ্য করেন, যেগুলো আগে তেমন একটা চোখে পড়তো না। কারোই চোখে পড়ে না। হয়তো ছায়া না থাকলেই কেবল এইসব বিষয় চোখে পড়ে। আখনজি লক্ষ্য করলেন, ছায়া সংক্রান্ত্র- জটিলতায় ভোগার ব্যাপারে তিনি মোটেও একা নন। তার আশপাশেই আরো বহু লোক এরকম সমস্যা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা কাউকে কিছু বলে না বলেই কারো চোখে পড়ে না। যেমন, আখনজি লক্ষ্য করলেন গুড়পট্টির উল্টোদিকে লেদমেশিনের দোকানটার ম্যানেজার সাহেব, যার নাকে একটা জড়-ল, তারও কোনো ছায়া পড়ে না। রেলগেটের পাশে সাইকেলের দোকানদার লোকটা, যিনি কিনা খুবই লম্বা, অথচ সবাই যাকে খাটো বলে ভুল করে, সেই কর্পুর সামনে-র সমস্যাটা আরো গভীর। তার ছায়াটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। অর্থাৎ ছায়াটা একবারে বিদায় না নিয়ে আসে- আসে- বিদায় নি"েছ। প্রখর রোদেও তার ছায়া জোৎস্নার আলোয় পড়া ছায়ার মতো ম্যাড়ম্যাড়ে লাগে। আর তাদের সমাজকল্যাণ অফিসের পিয়ন আনোয়ার পাশার ব্যাপারটা তো আরও অদ্ভুত। আনোয়ার পাশা লোকটা বেজায় মোটা। অথচ তার ছায়াটা পড়ে একেবারে লিকলিকে একটা মানুষের। দেখে মনে হয়, ছায়াটা বোধ হয় ভুলে অন্য কারো সাথে বদল হয়ে গেছে। মহিমগঞ্জের হাটে আখনজি এমন একটা লোককে আনমনে হাঁটতে দেখেছেন, দিনের বেলা রোদের মধ্যে যার দুটো ছায়া পড়ছিল। একটা শরীরের দুটো ছায়া, দুটো দুরকম, কী অদ্ভুত! আরো অদ্ভুত একটা ঘটনা দেখে তো আখনজির চক্ষু চড়কগাছ। যশোর বাসস্ট্যান্ডে তিনি এমন একটা লোককে দেখেছেন, যার শুধু ছায়াটা আছে, দেহটা নেই। অর্থাৎ কোনোভাবে লোকটার দেহ চুরি হয়ে গেছে, ছায়াটা থেকে গেছে। এটা কিভাবে ঘটতে পারে বা দেহ ছাড়া ছায়াটার চলতে ফিরতে সমস্যা হচ্ছে কিনা, বা একা একা লাগছে কিনা, এসব কথা তিনি লোকটাকে (বা ছায়াটাকে) জিজ্ঞেস করবেন বলে স্থির করেছেন কি করেননি, ততক্ষণে লোকটা নড়াইলগামী একটা বাসে উঠে বসেছে এবং বাসটা ছেড়ে দিয়েছে। তিনি অবশ্য পেছন পেছন দৌড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু খুব ভিড়অলা বাসে এমনকি পাদানিতে পা রাখারও অবস্থা ছিল না। তিনি দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছেন, অপসৃয়মান বাসের জানালার ধারে বসে ‘ছায়াসর্বস্ব’ লোকটা তার দিকে স্থির চেয়ে আছে। লোকটার চোখে তিনি এমন এক হতাশা, এমন এক লুকানো দীর্ঘশ্বাস দেখেছেন, যা তিনি আর কখনও কোথাও দেখেননি।
ছায়া হারানোর পর এভাবে ধীরে ধীরে একটা গোপন জগৎ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকলো আখনজির সামনে। সেই জগৎটা আমাদের চারপাশেই আছে, কিন্তু আমরা সেটা লক্ষ্য করি না। লক্ষ্য করার সময় পাই না। আখনজি সেটা লক্ষ্য করতে থাকলেন বলে তার হতাশা বা মন খারাপ ভাব যে একটু কমলো, তা মোটেও নয়। বরং আরো দ্বিগুণ হলো তার আক্ষেপ। ছায়াহীনতা তার অসহ্য লাগতে লাগলো। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একটা উপায় তিনি খুঁজতে শুরু করলেন।
অবশেষে একদিন বিকালবেলা তিনি যখন গুমটি ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ফেরিঅলার কাছ থেকে পেঁপে খাচ্ছেন, ঠিক তখনই চিন্তাটা তার মাথায় এলো : আচ্ছা, এই যে, চোরেরা যে ঘটিবাটি, স্যান্ডেল, টু ব্যান্ডের রেডিও, তারে শুকানোর জন্য নেড়ে দেওয়া আলোয়ান এসব চুরি করে, চুরি করার পর সেগুলো নিয়ে তারা কী করে? নিশ্চয়ই কোথাও বেচে দেয়। নাহলে তো এসব জিনিসে তাদের ঘর ভরে যাওয়ার কথা। নিশ্চয়ই বেচে দেয়! কারো কাছে বেচে দেয়। কোনো দোকানদার সেগুলো কিনে নেয়। তো, সেই যে বদমায়েশ, পাষণ্ড চোরটা তার ছায়া চুরি করে নিয়ে গেছে, সে কি আর এমনি এমনি সেটা নিয়ে গেছে। কোথাও বেচে দেওয়ার জন্যেই নিয়ে গেছে নিশ্চয়ই। তার মানে এই শহরেই কোথাও ছায়া কেনাবেচার কোনো দোকান আছে। থাকতেই হবে। আলবৎ আছে! নাহলে তার ছায়াটা চুরি হতোই না।

এই চিন্তা মাথায় আসায় পর বিচলিত হয়ে উঠলেন আখনজি। দুই টুকরো পেঁপের দাম না দিয়ে তিনি উদগ্রীব হয়ে হেঁটে চলে গেলেন। পেঁপেঅলাও তার কাছে থেকে টাকা চাইলো না। কেননা সেই মুহূর্তে জীবনের অর্থহীনতা বিষয়ক এক জটিল চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল পেঁপেঅলা এবং তার সবগুলো পেঁপেসহ পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যে এক বিশাল মায়া এই গভীর সত্যে প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল সে। এরকম মুহূর্ত একজন মানুষের জীবনে কালেভদ্রে আসে।
পরের কয়েকটা দিন আখনজি আতিপাতি করে খুঁজতে শুরু করলেন সেরকম একটা দোকান, যেটা ছায়া বিক্রি করে। কাজটা যে সহজ হবে না, তা তিনি গোড়াতেই ধরে নিয়েছিলেন। প্রথমত, এরকম একটা দোকান থেকে থাকলে, সেটা ছায়া হারানোর আগেই তার চোখে পড়ত। ছোট্ট মফস্বল একটা শহরে কয়টাইবা আর দোকান থাকে! “ছায়াবিতান”, “ছায়ালয়” “ছায়াঘর” এরকম কোনো সাইনবোর্ড তার কোনোদিনই চোখে পড়েনি। নদীর ধারে একটা হলুদ বাড়ি চোখে পড়েছে বটে, যেটার গেটে মার্বেল পাথরের ফলকে লেখা, “ছায়াবীথি”। তবে আখনজি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, ওই বাড়িতে এক রিটায়ার্ড জেলা জজ আর তার পোষা বিড়াল ছাড়া আর কেউ থাকে না। জজ সাহেবের একটা চোখ আর তার বেড়ালের একটা পা নেই বটে, তবে এটুকুই। ছায়া সংক্রান্ত কোনো জটিলতা তাদের নেই।
কাজেই আখনজি ভেবে দেখলেন, ছায়া বিক্রির দোকান নিশ্চয়ই গোপন, “আন্ডারকাভার” হবে। মানে, সাইনবোর্ডে তো উল্লেখ থাকবেই না, এমনকি বাইরে থেকে দেখেও বোঝার কোনো উপায় থাকবে না যে, সেটা একটা ছায়া বিক্রির দোকান। সেরকম একটা দোকান খুঁজে পাওয়ার কোনো উপায় তো চোখে পড়ছে না।
ভাবতে ভাবতে একটা উপায় উঁকি দিল আখনজির মনে। অফিসের পিয়ন আনোয়ার পাশাকে ধরলেন তিনি। সেই আনোয়ার পাশা, যারা ছায়াটা তার দেহের সঙ্গে মেলে না। সরাসরি তো আর বলা যায় না। একথা-সেকথার মাধ্যমে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেক পরোক্ষ ভঙ্গিতে কথাটা বললেন আখনজি, সেটা এতো পরোক্ষ যে প্রায় বোঝাই যায় না, কী প্রসঙ্গে বলা। আর আনোয়ার পাশাও এমন ঘুরিয়ে পেচিয়ে এতো দূর দিয়ে, এমন পরোক্ষভাবে জবাবটা দিলো যে, সেটা যে একটা জবাব বোঝার উপায় নেই।

আনোয়ার পাশার এইসব অনিশ্চিত কথাবার্তার সূত্র ধরে আখনজি একদিন ভরদুপুরে অফিস ফাঁকি দিয়ে গিয়ে হাজির হলেন রেললাইনের উল্টোদিকে বড় শিরিষ গাছের নিচে একটা ছাতার দোকানে। বাইরে সাইনবোর্ডে দোকানটার নাম লেখা “ছত্রধর”। ভেতরে খোলা আলমারিতে, কাঠের পাটাতনে নানারকম ছাতা সাজানো : টিপছাতা, ডাঁটওয়ালা ছাতা, কালো রঙের ছাতা, ফুল আঁকা চাইনিজ ছাতা আবার ওয়াকিং স্টিক ছাতা। ছাতা যে এতো বিচিত্র রকম হতে পারে, সেটা জানা ছিল না আখনজির। কিন্তু দোকানটায় অস্বাভাবিক কিছুই নেই। কাউন্টারে একটা মাঝবয়েসী টেকো লোক বসে আছে। তার মধ্যেও অস্বাভাবিক কিছুই নেই। লোকটা না লম্বা, না খাটো, না মোটা, না সরু। সবকিছু মাঝারি। আর আখনজি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে লোকটা যেভাবে হেসে সম্ভাষণ জানালো, আর দশটা Golpo_Chayahinদোকানেও সেভাবেই সম্ভাষণ জানানো হয়ে থাকে।
দোকানি আখনজিকে জিজ্ঞেস করলো , “কোন ধরনের ছাতা দেখাবো, স্যার?”
আখনজি একবার ভাবলেন ফিরে যান। কিন্তু তিনি সাহস সঞ্চয় করে আনোয়ার পাশার শিখিয়ে দেওয়া কথাটা বলে ফেললেন।
“আমার এমন একটা ছাতা দরকার যেটা বৃষ্টির সময় রোদ ঠেকায়, আর রোদের সময় বৃষ্টি।”
লোকটা কাউন্টার ছেড়ে আখনজির দিকে এগিয়ে আসছিল। কথাটা শোনামাত্র হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। চোখ পিটপিট করে আখনজির দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।
তারপর আখনজিকে ভেতরে রেখে দোকানের সাঁটার লাগিয়ে দিল বিকট “ঘড় ঘড়” শব্দে। শব্দটা এতো জোরালো হলো যে, আখনজির কলজে কেঁপে গেল।
তারপর লোকটা বলল, “এদিকে আসুন।”
আখনজি কোন দিকে যাবেন বুঝতে পারলেন না। শুধু লোকটার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
লোকটা এক কোণায় রাখা একটা ছাতার ডাট নাড়িয়ে দিলো। আর তাতে বিপরীত দিকের দেয়াল সরে যেতে লাগলো নিঃশব্দে। দেয়াল পুরো সরে গেলে দেখা গেল, ওপাশে বড় একটা চোরা কুঠুরি।
তারা দুজনাই সেই কুঠুরিতে পা রাখলেন।
আখনজি দেখলেন, আলোঝলমল এই কুঠুরিতেও বহু আলমারি থরে থরে সাজানো। দেরাজে দেরাজে ভাজ করা সুদৃশ্য প্যাকেট। কেউ বলে না দিলেও আখনজি টের পেলেন এই সব প্যাকেটেই পুরে রাখা হয়েছে মানুষের ছায়া। ঠিক যেভাবে রেইনকোট বা ম্যাকিনটোশ ভাঁজ কোরে ছোট প্যাকেটে রাখা হয়, সেভাবে ভাঁজ করে রাখা ছায়াগুলো।
লোকটা গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “সাইজ কতো?”
এই তো বিপদ! নিজের ছায়ার সাইজ তো আখনজির জানা নেই। আর ছায়ার কী নির্দিষ্ট সাইজ থাকে নাকি। দুপুরবেলা আর বিকালবেলার ছায়া তো দুরকম সাইজের হয়।
আখনজি অনেক বিতং করে লোকটাকে যেটা বোঝানোর চেষ্টা করলেন, সেটা হলো, তিনি আসলে নিজের হারিয়ে যাওয়া ছায়াটাই কিনতে এসেছেন। তিন মাস আগে এক সিঁদেল চোর ছায়াটা চুরি করে নিয়ে গেছে। সে যদি এই দোকানে ছায়াটা বিক্রি করে দিয়ে থাকে, তবে সেটা তিনি আবার কিনে নিতে চান। লোকটা বুঝলো বলেই মনে হলো। ফলে প্রতিটি আলমারির প্রতিটি তাকে রাখা প্রতিটি প্যাকেট খুলে খুলে ভাজ করা ছায়া বের করে দেখা হলো।
না। আখনজির ছায়াটি নেই।
এর মানে, হয় চোর ছায়াটা এখানে বিক্রি করেনি, নতুবা বিক্রি করেছিল, তবে ছায়াটা অন্য কেউ এখান থেকে কিনে নিয়ে গেছে।
এখন কী করা!
দোকানি লোকটা বেশ ঠাণ্ডা মাথার আর সহমর্মী। সে পরামর্শ দিলো, যতোদিন না তার ছায়াটি এই দোকানে আসছে, বা কে সেটা কিনেছে, তিনি খুঁজে বের করতে পারছেন, ততদিন কাজ চালানোর জন্য তিনি এখান থেকে একটা ছায়া কিনে নিয়ে যেতে পারেন। (দোকানি অবশ্য বলেছিল, “কিনে ব্যবহার করতে পারেন”। কিন্তু ছায়া “ব্যবহার করা” কথাটা দিয়ে যে ঠিক কী বোঝায়, আখনজির কাছে পরিস্কার হয়নি।)
কারণ ছায়া ছাড়া তো আর বেশিদিন চলা যায় না!
কথাটা আখনজির মনে ধরলো।
“তা আমি চাইলেই ছায়াটা বদলে নিতে পারবো তো? মানে ধরুন, যখন আমার ছায়াটি পেয়ে গেলাম, তখন? বা এই ছায়াটা আমার পছন্দ না হলে আমি বদলে আরেকটা ছায়া নিয়ে যেতে পারবো তো?”
“নিঃসন্দেহে। এটা কোনো ব্যাপারই না। আগেরটা ফেরত দিয়ে নতুনটা নিয়ে যাবেন, ঠিক যেভাবে মানুষ জুতা বদলায় সেভাবে। আমরা মেমো দিয়ে দেবো।”
বেশ ভালো বন্দোবস্ত তো!
আখনজি আশ্বস্ত হলেন।
তারপর তিনি ছায়া পছন্দ করতে শুরু করলেন। এই কাজটা তার খুবই কঠিন মনে হলো। ছায়া যে ঠিক কিভাবে বাছতে হয়, মানে একটা ছায়ার তুলনায় আরেকটা ছায়ার ভালোমন্দ যে ঠিক কিভাবে আলাদা করতে হয়, সেটা তার জানা নেই। অনভ্যস্ততা। হয়তো শিগগির তিনি শিখে নেবেন।
এভাবে বাছতে বাছতে তিনি একটা ছায়া পছন্দ করলেন। মানে পছন্দ হয়েছে বলে ভাণ করলেন।
ছায়াটা মোটামুটি তার শরীরের সঙ্গে যায়। আনোয়ার পাশার মতো ওরকম বেঢপ, বে-ফিট দেখাবে না।
দাম?
কিভাবে দামাদামি করবেন?
আনোয়ার পাশা বলে দিয়েছিল যে, দোকানটার সব ভালো। শুধু একটা জিনিস ছাড়া। ব্যাপক দর কষাকষি করতে হয়। আনোয়ার পাশা অবশ্য দরকষাকষির বদলে “মুলামুলি” শব্দটি ব্যবহার করেছিল।
আখনজিও তুমুল মুলামুলি করলেন।
তারপর দাম মিটিয়ে ছায়াটা নিয়ে বেরিয়ে এলেন।

পরের একটা মাস আখনজির মোটামুটি ভালো কাটলো।
নতুন ছায়া নিয়ে তিনি কিছুটা উচ্ছ্বসিত ভাব দেখালেন। নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তিনি ছায়া দেখেন। দুপুরে বা বিকালে হাঁটার সময় তাকে সর্বদা দেখা যায়, নিচে ছায়ার দিকে চেয়ে হাঁটছেন। এতে ছোটখাটো দুর্ঘটনা যে ঘটলো না, তা নয়। বাসায় চেয়ারে বসে তিনি মোমের আলোয় দেয়ালে পড়া অস্থির কাঁপাকাঁপা ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে সেটার দিকে চেয়ে হাত নাড়েন। ছায়াটিও হাত নাড়ে।
কিন্তু এক মাস মাত্র।
তারপর আখনজি অনুভব করতে শুরু করলেন, ছায়াটি তাকে ঠিকমতো “স্যুট” করছে না।
এমনিতে কোনো সমস্যা নেই। তিনি যা করেন, ছায়াও তাই করে। কিন্তু কেমন যেন অনীহা নিয়ে করে। করার যেন মোটেও ইচ্ছা নেই। ছায়ার এই অবাধ্যতা এতোই সূক্ষ যে, কাউকে বলে বোঝানো মুশকিল।

ধীরে ধীরে আখনজির অস্বস্তি বাড়তে থাকলো। সেটা এমন পর্যায়ে গেল যে, আখনজি ঠিক করলেন, ছায়াটি তিনি ফেরত দিয়ে আসবেন। অন্যের ছায়া নিয়ে চলার চেয়ে, কোনো ছায়া না থাকা বরং ভালো। যতোদিন নিজের ছায়াটি ফেরত না পাচ্ছেন, ততদিন তিনি বরং ছায়াহীন অবস্থায় প্রতীক্ষা করবেন।
ছায়া ফিরিয়ে দিতে আখনজি রেললাইনের উল্টোদিকে শিরিষ গাছের তলায় গেলেন।
কিন্তু গিয়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন।
সেই ছাতার দোকানটি নেই।
যেখানে দোকানটি ছিল, সেখানে এখন একটা সাইকেলের দোকান।
আখনজি সেই দোকানে ঢুকে নানান সাংকেতিক ভাষায় দোকানদারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে বুঝলেন, লাভ নেই। এটা সাধারণ একটা সাইকেলের দোকানই। তার বেশি কিছু নয়।
সেই ছাতার দোকানটা হঠাৎ করেই হাওয়া হয়ে গেছে।
শহরের কোথাও আর সেটা খুঁজে পাওয়া গেল না।
আখনজির আর ছায়া ফেরত দেওয়া হলো না।
আখনজি হতাশায় ডুবে গেলেন।
ভিন্ন একটা মানুষের ছায়া নিয়ে তাকে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে, এমন একটা ছায়া যা তাকে স্যুট করে না।