মাহফুজ-উল-ইসলাম
আজ তোমাদের এক আশ্চর্য প্রাণীর গল্পই শোনাবো। এরা নিজেরাই বাড়ি তৈরী করে। তাও একবারে যেনতেন বাড়ি নয় কিন্তু, রীতিমত প্রাসাদই গড়ে তোলে তারা। শুধু তাইই নয়, এরা খুবই পরিশ্রমী, পরোপকারী আর সামাজিকও বটে। এদের মধ্যেও মানুষের মতো শ্রেণীবিভাগ আছে। আছে এক এক শ্রেণীর প্রাণীর এক এক ধরণের কাজ। ভাবছো নিশ্চয়ই যে কি সেই প্রাণী! তাই না? এরা হলো মৌমাছি। আমাদের সবার খুবই পরিচিত; মৌমাছি।
পৃথিবীতে প্রায় ২০,০০০ প্রজাতির মৌমাছি আছে। এদের কেউ একা থাকে আবার কেউ বা থাকে দলবদ্ধ ভাবে। কেউ আছে প্রচুর মধু জমা করে আবার কেউ একেবারেই করে না। কেউ বা উদ্দাম, পোষ না মানা, ঘুরে বেড়ায় বনে-বাদাড়ে। আবার কেউ কেউ থাকে মানুষের পোষ মেনে। কি, অবাক হলে? মৌমাছি আবার পোষ মানবে কিভাবে? কিছু কিছু প্রজাতি কিন্তু আছে, যাদেরকে মানুষ পোষ মানাতে পেরেছে। আরা এই পোষ মানা মৌমাছিদেরকে নিয়েই মৌচাষীরা তৈরি করে মৌ-খামার। বাজারের বেশীরভাগ মধুই কিন্তু আসে এসব খামার থেকে।
মৌমাছিদের প্রাসাদের কিন্তু একটা নাম আছে। তোমরা সবাই জানো সেটা। একে বলে মৌচাক (Bee Hive)। মৌমাছিরা এটি তৈরী করে শীত বা অত্যাধিক গরম থেকে নিজেদের বাঁচাতে, খাবার জমা রাখতে এবং থাকার জন্য স্থায়ী আশ্রয় হিসেবে। এক একটি মৌচাকে প্রায় ২০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ পর্যন্ত মৌমাছি থাকে!
মৌমাছিদের প্রধানত তিনটি শ্রেণী আছে। রাণী মৌমাছি, রাজা মৌমাছি এবং কর্মী মৌমাছি। একটি মৌচাকে, এতোগুলো মৌমাছির মধ্যে রাণী থাকে কেবল মাত্র একটি। আর রাজা! তোমরা তো জানো যে একটি দেশে কেবল একজনই রাজা থাকেন। কিন্তু মৌমাছিদের রাজা থাকে কয়েক‘শো, আর বাকিরা সব কর্মী। অবাক হচ্ছো, তাই না? ওদের সমাজটাই যে এরকমের।
রাণী একজন হলেও সেই কিন্তু মৌচাকের সর্বময় কর্ত্রী। সবাই তার কথা মেনে
চলে। আকারেও এরা অন্যান্যদের চেয়ে বড়ই হয়, প্রায় ১.৮ থেকে ২.২
সেন্টিমিটার। ডিম ফুটে বেরও হয় তাড়াতাড়ি। মাত্র ১৬ দিনের মাথায় পূর্ণাঙ্গ
রাণী ডিম থেকে বের হয়ে আসে। রাণী মৌমাছির কাজ হচ্ছে, মৌচাকের বাকি
কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা আর ডিম পাড়া। প্রতিদিন এরা প্রায় ১০০০ টিরও বেশী
ডিম পেড়ে থাকে। মজার ব্যাপার হলো রাণী কিন্তু ডিম পাড়ে হুল দিয়ে! কি অবাক
হলে? অবাক হবার কিছু নেই। মৌমাছিরা হুল দিয়ে আত্মরক্ষাও করে, আবার ডিমও
পাড়ে। একটি রাণী মৌমাছি বাঁচেও বেশিদিন, প্রায় চার থেকে সাত বছর। ভাবছো এ
আর এমনকি। হ্যাঁ, আমাদের কাছে বিষয়টি তেমন কিছু না হলেও ওদের কাছে কিন্তু
অনেক কিছু। কারণ, একটি রাজা মৌমাছি বাঁচে মাত্র কয়েকদিন আর একটি কর্মী
মৌমাছি বাঁচে বড়জোর কয়েক সপ্তাহ মাত্র। একটি মৌচাকে রাণী মৌমাছি থাকে
মাত্র একটি। তবে যদি ডিম ফুটে কোন নতুন রাণী মৌমাছির জন্ম হয়েই যায়
সেক্ষেত্রে মৌচাকটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। মানে হলো, আগের রাণী মৌমাছি
পুরোনো কিছু কর্মী নিয়ে নতুন চাক বানিয়ে সেখানে চলে যায়।
রাজা মৌমাছিরা ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ হতে সময় নেয় ২৪ দিন। এরা হলো সব কুঁড়ের বাদশাহ। কোন কাজ করে না, সারাদিন শুধু খায় দায় আর ঘুরে বেড়ায়! বসে বসে খায় বলেই এরা কর্মীদের চেয়ে একটু বড় আকারের হয়, প্রায় ১.৫ থেকে ১.৭ সেন্টিমিটার। কর্মীদের মতো কাজ করতে হলে তবে বুঝতো মজা। রাজা মৌমাছির চোখ আবার অন্যান্যদের থেকে বড় হয়। এটি দিয়েই রাজার সঙ্গে পার্থক্য করা হয় কর্মী মৌমাছিদের। তবে শুধু বসে বসে খায় বলে, যখন খাবার থাকেনা তখন কিন্তু এদের তাড়িয়ে দেয় কর্মী মৌমাছিরা। আরেকটা মজার কথা হলো, রাজা মৌমাছির কিন্তু হুল নেই। তার পরেও বিপদে পড়লে, এরা হুল ফোটাতে ছুটে যায় ভোঁ ভোঁ করে। মানে ভয় দেখায় আর কি! যারা চেনে না কোনটা রাজা মৌমাছি আর কোনটা কর্মী মৌমাছি, তারা তো ভয় পাবেই।
মৌচাকের যত ধরণের কাজ আছে, তার সবই করে কর্মী মৌমাছিরা। যেমন ধর, মৌচাকের ঘর (Cell) গুলো পরিস্কার করা, বাচ্চাদের খাবার দেয়া, মৌচাক তৈরী করা, মধু জমা করা এমনকি মৌচাক রক্ষা করার দায়িত্বও কিন্তু এদের। কর্মী মৌমছিরা আকারে সবচেয়ে ছোট, প্রায় ১.২ থেকে ১.৫ সেন্টিমিটার। ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ হতে এরা সময় নেয় মোটামুটি ২১ দিন। পূর্ণাঙ্গ হতে না হতেই কাজে লেগে পড়ে এরা। কর্মীদের প্রথম কাজ হলো মৌচাক মানে ওদের সেই প্রাসাদটি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা। তারপর করতে হয় বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজ। এরপরে আসে মধু সংগ্রহ করে তা জমা করা। এমনকি মৌচাক প্রাসাদের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করাটিও এই কর্মী মৌমাছিদেরই কাজ। এরা পাখা দিয়ে বাতাস করে মৌচাকের তাপমাত্রা বাড়াতে বা কমাতে পারে। এভাবে এরা মৌচাকের তাপমাত্রা সবসময়ই ৩৪০ সে. এর কাছাকাছি রাখে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিটা ওরা আগে থেকেই জানে। সবচে অভিজ্ঞ কর্মীরা থাকে রক্ষণাবেক্ষণ বা গার্ডের দায়িত্বে। এরা চাকের চারদিকে ঘোরাঘুরি করে আর মৌচাকের ওপর নজর রাখে। যদি অন্য কোন মৌচাকের মৌমাছিরা এসে মধু চুরি করে বা যদি ডাকাত’রা আসে তাদেরকে আটকানোটাই ওদের কাজ। ভাবছো নিশ্চয়, মৌমাছিদের মধ্যে আবার ডাকাতও আছে নাকি? হ্যাঁ, তাতো আছেই। আমাদের সমাজের মতো ভালো মন্দ মৌমাছিদের সমাজেও আছে; মৌমাছিদেরও ডাকাত আছে। এরা হল ভীমরুল বা বোলতা। এরা নিজেরা ভবিষ্যতের জন্য কিছু জমা করে না। শুধু মৌমাছিদের উপর ডাকাতি করেই চলে। গার্ড মৌমাছিরাও কিন্তু কম যায় না, ডাকাতি করতে এলেই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের উপর। তখন তারা নিজের জীবনটিরও পরোয়া করেনা। কি সাহসী তাই না!
এমনিতে কিন্তু মৌমাছিরা খুবই শান্তিপ্রিয়। বিনা কারণে এরা কাউকেই বিরক্ত করেনা। শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্যই এরা হুল ফোটায়। তাছাড়া নয়। কারণ কর্মী মৌমাছিরা মাত্র একবারই হুল ফোটাতে পারে। এদের হুলের গঠন অনেকটা বড়শির মতো। মানে মাথাটা কাঁটাওলা। একবার কোথাও ফোটালে তা আর বের করে নিতে পারে না। হুল ফোটানোর পরে ঐ কর্মী মৌমাছিটা সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। রাণী মৌমাছিদের হুল আবার সোজা এবং লম্বা। যা প্রধানত ডিম পাড়তেই তারা ব্যবহার করে।
তবে পৃথিবীতে হুল ছাড়াও মৌমাছি আছে। এরকম প্রায় ১৪ টি প্রজাতির মৌমাছি
নাকি আছে এই পৃথিবীতে যাদের কোনো হুল নেই। এদের পাওয়া যাবে অস্ট্রেলিয়ায়
গেলে। হুল নেই বলে সেখানকার লোকজন এদের বেজায় ভালোবাসে। আর এদের মধুর
স্বাদও একটু অন্যরকম, টক-মিষ্টি, সঙ্গে হালকা লেবুর গন্ধ। তবে এরা মধু জমা
করে খুবই কম।
মৌমাছিই যে আমাদের মধু দেয়, সেটা কে না জানে। তবে জানার বিষয় হলো মাত্র ১
পাউন্ড ( ১ পাউন্ড = ০.৪৫৩৬ কে.জি. প্রায়) মধু জমা করতে এদেরকে প্রায়
৯০,০০০ কিলোমিটার পথ উড়তে হয় আর ১,০০,০০০ এরও বেশি ফুলে যেতে হয় এই মধুর
সংগ্রহে। ভাবো একবার! কি পরিমাণ পরিশ্রম করে তবেই না এই মৌমাছিরা মধু জমা
করে। মজার ব্যাপার হলো, এরা এদের মৌচাক থেকে ২ কিলোমিটারের বেশি দূরে কখনই
যায় না। এর বেশি যেতে পারে, তবে ফিরে আসতে পারে না, পথ ভুলে যায়। সেজন্য
মৌচাকের আশেপাশে থেকেই তারা এতটা পথ পাড়ি দেয়। অর্থাৎ বার বার যাওয়া আসা
করে তবেই এই মধু তারা নিয়ে আসে।

মৌমাছিরা কিন্তু মধু জমা করে রাখে তাদের বাচ্চাদের খাবার আর ভবিষ্যতের
জন্য। তোমরা কি জানো মৌমাছিরা কিন্তু রুটিও বানায়। ওদের প্রধান খাবার
হচ্ছে পরাগ রেণু আর মধু। এ দুটো মিশিয়ে এরা যে খাবারটা বাচ্চাদের খাওয়ায়
তাকে মৌ-রুটি (Bee-Bread) বলে। যখন এই পরাগরেণু আর মধু পাওয়া যায়না তখনই
এদের খাবারের অভাব দেখা দেয়। যেহেতু পরাগ রেণু আর মধু দুটোই পাওয়া যায় ফুল
থেকে, তাই ফুল যখন কম ফোটে তখনই এদের খাবার কম থাকে।
মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌচাকে নিয়ে এসে একটা ঘরে জমা করে। সে
সময় মধু কাঁচা থাকে। মানে হলো, মধুতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে। পরে কর্মী
মৌমাছিরা ডানা দিয়ে বাতাস করে পানির পরিমাণ কমিয়ে ফেলে। এতে মধু অনেকদিন
ভালো থাকে। এক সময় যখন ঘরটা পূর্ণ হয়ে যায় তখন এরা মধুর ঘরটাকে মোমের
ঢাকনা দিয়ে আটকে দেয়। যেন বাইরে থেকে ভেতরে ময়লা না পড়ে। এভাবে যতদিন
পাওয়া যায় ততদিন পর্যন্ত এরা মধু জমা করতেই থাকে।
এতক্ষণ ধরে কি শুনলে? মনে হলো না বুদ্ধিমান কোন প্রাণীর কথা শুনছি! হ্যাঁ, মৌমাছিদেরও কিন্তু নিজস্ব সমাজ আছে। আছে নিজস্ব নিয়মনীতি। এই নিয়মনীতি মেনেই কিন্তু তারা চলে। কখনোই তারা তাদের সমাজের কোন নিয়ম ভাঙে না। শুধু তাই নয় মৌমাছিদের মধ্যে আছে পরিশ্রম করার মানসিকতা। তবে আমরা কিন্তু মৌমাছিদের কাছ থেকে মধু ছাড়াও আরো অনেক কিছুই পাই। চলো শুনি সেসবের কথা।
মোম : মৌচাক তৈরীতে ব্যবহৃত তো হয়ই আবার মোম থেকে আমাদের জন্য ওষুধও তৈরী হয়।
রয়্যাল-জেলি : মৌমাছিদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার। রাণীদের বেশিদিন ধরে
খাওয়ানো হয়। আর অন্যান্যদের কম। আমাদের জন্য এটি ঔষধ তৈরিতে কাজে লাগে।
খুব কম পরিমাণে পাওয়া যায় বলে এর দামও অনেক বেশি।
প্রপোলিস : এক ধরণের আঠা, যা মৌচাকের ঘরগুলোকে এক সঙ্গে ধরে রাখে। এটির জীবাণু-বিরোধী গুণ আছে। আমাদের কাছে এর ঔষধি-মূল্য অনেক।
মৌমাছির বিষ : হুল ফুটিয়ে এই বিষের ব্যবহার করে মৌমাছিরা। এর জন্যই হুল ফোটানো জায়গাটায় জ্বালা-পোড়া হয়। এরও ঔষধি গুণ অনেক বেশি।
শুনলে তো আমরা মৌমাছিদের কাছ থেকে মধু ছাড়াও আরো কি কি পেয়ে থাকি! তবে
এখনও আসল কথাটা কিন্তু বলাই হয় নি। মৌমাছিরা তো মধু সংগ্রহ করতে এক ফুল
থেকে আরেকটি ফুলে যায়। এভাবে অনেক ফুলে ফুলে ঘুরে ঘুরেই তারা মধু সংগ্রহ
করে। স্বাভাবিক কারণেই তারা শরীরের সঙ্গে এক ফুলের পরাগরেণু বহন করে নিয়ে
যায় অন্য ফুলে। এভাবেই হয় পরাগায়ন। পরাগায়ন ছাড়া উদ্ভিদ বংশবিস্তার করতে
পারতো না। বেশিরভাগ গাছেরই ফল, সব্জী, বীজ কিছুই হতো না পরাগায়ন ছাড়া।
আমাদের প্রিয় ফল, সব্জী এমনকি ধান উৎপাদনের জন্য পরাগায়ন জরুরী। এক কথায়
বলা সম্ভব যে পরাগায়ন ছাড়া কোন কিছুই উৎপন্ন হতো না। এই পরাগায়নেই সাহায্য
করে মৌমাছি। একবার ভেবে দেখো তো! মৌমাছি ছাড়া আমাদের কি হতো! আমরা হয়তো না
খেয়ে মরেই যেতাম ।
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/মাহফুজ/শুভ/এইচআর/মার্চ ১১/১০








