টুনির ঘরেও সে ধন আছে!
বড় মজা বড় মজা
রাজা খেলেন ব্যাঙ ভাজা!
এক টুনিতে টুনটুনাল
সাত রানির নাক কাটাল!
নাক-কাটা রাজা রে
দেখ তো কেমন সাজা রে!
কী, চিনতো পারোনি? টুনটুনির গল্প পড়োনি, তোমাদের মধ্যে এমন বেরসিকও আছে বুঝি? এতোক্ষণে চিনেছো; এতো সেই ‘টুনটুনি আর রাজার কথা’ গল্পের টুনটুনির ছড়া, যে রাজার ভাণ্ডার থেকে একটা টাকা নিয়েছিল। আর সেই টাকা উদ্ধার করতে গিয়ে রাজা যে কী জব্দটাই না হয়েছিল!
তারপর সেই রঙ্গা-ভঙ্গার গল্পটা মনে আছে? ঐ যে এক কুঁজো বুড়ির ছিল দুই কুকুর, রঙ্গা আর ভঙ্গা। বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে চলতো, আর বুড়ির মাথাটা খালি ঠকঠক করে নড়তো। একদিন সে যাচ্ছিল তার নাতনির বাড়ি। পথে এক শিয়াল ভাবলো, বুড়িকে খাবো। কিন্তু মাথা ঠকঠক করে নড়লে কী হবে, বুড়ির সেই নড়বড়ে মাথায় কিন্তু বুদ্ধি ছিল ভালোই। সে বুদ্ধি করে শিয়ালকে গান শোনানোর কথা বললো। আর গানের নাম করে একটা ঢিপির উপরে উঠে সুর ধরে চেঁচিয়ে উঠলো- ‘আয়, আয়, রঙ্গা-ভঙ্গা, তু-উ-উ-উ-উ!’ আর তারপর দুই কুকুর এসে লোভী শেয়ালটাকে এমন নাকাল করলো, সে আর কী বলবো!
ভাবছো, আজ বুঝি তোমাদের শুধু এসব গল্পই শোনাবো? তা শোনাবো, গল্প শোনাবো এই বিখ্যাত গল্পগুলোর বিখ্যাত স্রষ্টার গল্প। হ্যাঁ, আজ তোমাদেরকে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর গল্প শোনাবো। কেন? ১১ মে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জন্মদিন যে!
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর গল্প
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জন্ম ১৮৬৩ সালের ১১ মে, ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ
মহকুমার মসূয়া গ্রামে। এই কিশোরগঞ্জ মহকুমাই এখন কিশোরগঞ্জ জেলা হয়ে গেছে।
তার বাবার নাম শ্যামসুন্দর রায়চৌধুরী, দাদার নাম লোকনাথ; আর মা’র নাম
জয়তারা রায়চৌধুরী, নানার নাম রামকান্ত। এখন, তাদের পরিবারের পদবী নিয়ে একটা
মজার গল্প আছে।
কী, চিনতো পারোনি? টুনটুনির গল্প পড়োনি, তোমাদের মধ্যে এমন বেরসিকও আছে
বুঝি? এতোক্ষণে চিনেছো; এতো সেই ‘টুনটুনি আর রাজার কথা’ গল্পের টুনটুনির
ছড়া, যে রাজার ভাণ্ডার থেকে একটা টাকা নিয়েছিল। আর সেই টাকা উদ্ধার করতে
গিয়ে রাজা যে কী জব্দটাই না হয়েছিল!
তারপর সেই রঙ্গা-ভঙ্গার গল্পটা মনে আছে? ঐ যে এক কুঁজো বুড়ির ছিল দুই
কুকুর, রঙ্গা আর ভঙ্গা। বুড়ি লাঠি ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে চলতো, আর বুড়ির মাথাটা
খালি ঠকঠক করে নড়তো। একদিন সে যাচ্ছিল তার নাতনির বাড়ি। পথে এক শিয়াল
ভাবলো, বুড়িকে খাবো। কিন্তু মাথা ঠকঠক করে নড়লে কী হবে, বুড়ির সেই নড়বড়ে
মাথায় কিন্তু বুদ্ধি ছিল ভালোই। সে বুদ্ধি করে শিয়ালকে গান শোনানোর কথা
বললো। আর গানের নাম করে একটা ঢিপির উপরে উঠে সুর ধরে চেঁচিয়ে উঠলো- ‘আয়,
আয়, রঙ্গা-ভঙ্গা, তু-উ-উ-উ-উ!’ আর তারপর দুই কুকুর এসে লোভী শেয়ালটাকে এমন
নাকাল করলো, সে আর কী বলবো!
ভাবছো, আজ বুঝি তোমাদের শুধু এসব গল্পই শোনাবো? তা শোনাবো, গল্প শোনাবো এই
বিখ্যাত গল্পগুলোর বিখ্যাত স্রষ্টার গল্প। হ্যাঁ, আজ তোমাদেরকে
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর গল্প শোনাবো। কেন? ১১ মে উপেন্দ্রকিশোর
রায়চৌধুরীর জন্মদিন যে!
নাম হলো ‘উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী’
তাদের পরিবারের পদবী কোনটা বলো তো? রায়চৌধুরী? উঁহু। আসলে তাদের পরিবারের
পদবী ছিল ‘দেব’। কিন্তু পাড়া-পড়শিরা তাদেরকে ‘দেব’ বলতো না, বলতো ‘রায়’।
এভাবে তাদের পরিবারের পদবী একবার পাল্টে ‘দেব’ থেকে হলো ‘রায়’। ঈশা খাঁর
নাম শুনেছো না? বাংলার বিখ্যাত ১২ জমিদার, মানে বারো ভূঁইয়াদের সবচেয়ে
বিখ্যাত জমিদার ঈশা খাঁ। ১৬ শতকের শেষ দিকে এই ঈশা খাঁর জমিদারির এক
কাছারিতে কাজ করতেন তাদের এক পূর্বপুরুষ। তিনি হিসেব লেখার কাজ করতেন। ঈশা
খাঁ তাকে ‘খাসনবিশ’, ‘মজুমদার’ উপাধি দিয়েছিলেন। এই মজুমদার আবার পাল্টে
হয়ে গেল ‘চৌধুরী’। সবমিলিয়ে পরিবারের পদবী হয়ে গেল ‘রায়চৌধুরী’। তবে তার
বিখ্যাত পুত্র আর পৌত্র, মানে ছেলে সুকুমার রায় আর নাতি সত্যজিত রায় পুরো
পদবী ব্যবহার করেননি। তারাও কোন অংশেই উপেন্দ্রকিশোরের চেয়ে কম বিখ্যাত
ছিলেন না!
উপেন্দ্রকিশোরের নাম নিয়ে আরো একটা মজা আছে; ছোটবেলায় তার নাম
উপেন্দ্রকিশোর ছিলোই না! তার নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়। ওদিকে মসূয়ার, মানে
তাদের গ্রামের যে জমিদার, হরিকিশোর রায়চৌধুরী, তিনি সম্পর্কে তাদের আত্মীয়
হতেন। তার আবার কোনো ছেলে ছিল না। কিন্তু তার বিষয়-সম্পত্তিও তো দেখভাল করা
দরকার। কাজে কাজেই তিনি শ্যামসুন্দরের ছেলে কামদারঞ্জনকে নিজের কাছে রেখের
নিজের ছেলের মতো আদরে-যত্নে মানুষ করতে শুরু করলেন। তখন হরিকিশোরের সাথে
মিলিয়ে তার নাম রাখা হলো উপেন্দ্রকিশোর। তখন কামদারঞ্জন, মানে
উপেন্দ্রকিশোরের বয়স ৫ বছর।
উপেন্দ্রকিশোরের পড়ালেখা
উপেন্দ্রকিশোরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আরম্ভ হয় ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে। আর
ওই স্কুলেও তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন- চিত্রকর মানে ছবি আঁকিয়ে হিসেবে,
একইসাথে বাঁশি ও বেহালাবাদক হিসেবেও। তিনি নাকি সারাদিন বাঁশি আর বেহালা
নিয়েই থাকতেন। সব্বার ধারণা ছিল, ওই ছেলে এন্ট্রান্স পাসই করতে পারবে না!
কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর বলে কথা, তিনি কী আর কম মেধাবী! তিনি ঠিকই এন্ট্রান্স
পাস করে সব্বাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন।
এবার তো উপেন্দ্রকিশোরকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিতে হয়, কী বলো? হরিকিশোর আর
শ্যামসুন্দর পরামর্শ করে উপেন্দ্রকিশোরকে পাঠিয়ে দিলেন কলকাতায়, ভর্তি
করিয়ে দিলেন মেট্রোপলিটান কলেজে। এখন অবশ্য এই নামের কোনো কলেজ পাবে না,
কলেজটির নাম যে পাল্টে গেছে। এখন এই কলেজেরই নাম বিদ্যাসাগর কলেজ। ১৮৮৪
সালে এখান থেকেই উপেন্দ্রকিশোর বিএ পাস করেন।
বিয়ে করলেন উপেন্দ্রকিশোর
পরের বছর, ৮৫ সালে, বিয়ে করলেন উপেন্দ্রকিশোর। কনের নাম বিধুমুখী। বিয়ের
পরে উঠলেন ১৩ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে। ছবি এঁকে আর ফটোগ্রাফি করে
উপার্জন করতেন। উপেন্দ্রকিশোর- বিধুমুখীর ছিল দুই ছেলে- তিন মেয়ে : সুখলতা,
সুকুমার, পূণ্যলতা, সুবিনয় ও শান্তিলতা। হ্যাঁ, এই সুকুমারই তোমাদের আরেক
প্রিয় লেখক সুকুমার রায়। আর তারই ছেলে সত্যজিত রায়, ফেলুদা আর শঙ্কুর
স্রষ্টা। এই সত্যজিতই তার দাদা উপেন্দ্রকিশোরের গল্প ‘গুপী গাইন ও বাঘা
বাইন’-এর কাহিনী অবলম্বনে তৈরি করেন ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ নামের বিখ্যাত
চলচ্চিত্র।
উপেন্দ্রকিশোর অনেকবার ঠিকানা বদলে শেষমেশ ওঠেন ২২ নম্বর সুফিয়া স্ট্রিটের
বাড়িতে; এখন এই সড়কটির নাম কৈলাস বোস স্ট্রিট। এই বাড়িটি কিন্তু বেশ
বিখ্যাত। কেন বলোতো? এই বাড়ি থেকেই ১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোরের সম্পাদনায়
প্রকাশিত হয় বিখ্যাত ‘সন্দেশ’ পত্রিকা। আর এই সন্দেশের হাত ধরেই আসেন তার
পুত্র, বিখ্যাত রায়দের দ্বিতীয়জন- সুকুমার রায়। হাতিমি, বকচ্ছপ, হাঁসজারু
নিয়ে।
মারা গেলেন মৃত্যুঞ্জয়ী লেখক
১৯১৪ সালে আবার বাড়ি বদলালেন উপেন্দ্রকিশোর, এবার উঠলেন ১০০ নম্বর গড়পার
রোডের বাড়িতে। এই বাড়িটা শুধু যে তার নিজস্ব বাড়ি ছিল তাই না, এই বাড়ির
নকশাও তিনি নিজেই করেছিলেন। কিন্তু কী দুঃখের বিষয়, নিজের নকশা করা বাড়িতে
উঠতে না উঠতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন সবে তার বয়স ৫০ পেরিয়েছে।
কলকাতার বাঘা বাঘা সব ডাক্তারদের দেখানো হলো, কিন্তু কিছুই হলো না। সবাই
ভাবলো, হাওয়া বদলে দেখা যাক। তাকে পাঠানো হলো গিরিডিতে। কিন্তু তাতে ফল হলো
উল্টো, তিনি আরো অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে আবার কলকাতায় নিয়ে আসা হল। লাভ
হচ্ছে না দেখেও চিকিৎসকরা তাকে সুস্থ করতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন।
উপেন্দ্রকিশোরের মতো লোককে কী আর মরতে দেয়া উচিত?
কিন্তু মৃত্যুকে তো আর পরাস্ত করা যায় না; ১৯১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর সকাল
৮টায় মারা গেলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, মারা গেলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের
অবিস্মরণীয় লেখক।
তোমাদের জন্য উপেন্দ্রকিশোরের রচনাউপেন্দ্রকিশোর কিন্তু লেখালেখির শুরুতে তোমাদের জন্য লিখতেন না। লিখেছিলেন অনেক কিছুই, কিন্তু ঠিক যেন নিজের মনের মতো লিখতে পারছিলেন না। জীব-জন্তু কীট-পতঙ্গ নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন, ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন, এমনকি ‘সখা’ নামের পত্রিকায় একটা উপন্যাসও লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু নিজেকে আবিষ্কার করতে পারেননি।
এক সময় নিজেকে আবিষ্কার করেন উপেন্দ্রকিশোর, লিখতে শুরু করেন ছোটদের জন্য। তখন যতো শিশু-কিশোর পত্রিকা বের হতো, সবগুলোতেই লিখেছিলেন তিনি; লিখেছিলেন সখা, মুকুল, সন্দেশে। লিখেছেন গল্প, নাটক, রূপকথা, উপকথা, বিজ্ঞান-প্রবন্ধ, ছড়া।
শুধু যে লিখেছিলেন, তাই নয়, আঁকতেনও। আগেই তো বলেছি, স্কুলে থাকতেই তিনি আঁকিয়ে হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। তার অধিকাংশ বইয়ের প্রচ্ছদ তো বটেই, ভেতরের ছবিগুলোও তিনি নিজেই এঁকেছিলেন।
তার বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত ছেলেদের রামায়ণ আর টুনটুনির বই। এই বইদু’টিই বলতে গেলে জীবদ্দশাতেই তাকে ভীষণ জনপ্রিয় করে তোলে। তোমাদের জন্য উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর লেখা বইগুলো হলো- ছেলেদের রামায়ণ (১৮৯৬), সেকালের কথা (১৯০৩), ছেলেদের মহাভারত (১৯০৮), মহাভারতের গল্প (১৯০৯), টুনটুনির বই (১৯১০), ছোট্ট রামায়ণ (১৯১১), আরও গল্প (১৯১৭), পুরাণের গল্প (১৯১৯)। ব্রাকেটে প্রকাশের সাল দেখেই নিশ্চয়ই বুঝে গেছো, শেষ বই দু’টি প্রকাশিত হয়েছে তার মৃত্যুর পরে।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সমস্ত গল্পই তো শুনলে, এবার তাহলে তাকে শুভ জন্মদিন বলাই যায়, তাই না? সবাই মিলে একসাথে বলো- শুভ জন্মদিন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, স্বর্গে তোমার জীবন শুভ হোক, স্বর্গে আনন্দে থাকো, আর আমরা মর্ত্যে বসে তোমার লেখা পড়ে আনন্দে থাকি।
[‘চিরকালের সেরা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী’ গ্রন্থের সম্পাদক বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখিত গ্রন্থটির ভূমিকা অবলম্বনে লেখা]
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/এনজে/সাগর/এইচবি/মে ৯/২০১২








