যদি যেতেই চাও সেই নৌভ্রমণে তবে নেত্রকোনা থেকে সুনামগঞ্জ এই বর্ষায় সবচে ভালো জলপথ। কিভাবে যাবে? প্রথমে ঢাকা থেকে একটি বাসে চড়ে চলে যেতে হবে নেত্রকোনা। তবে নেত্রকোনায় যাওয়ার রাস্তাটি কিন্তু কোথাও কোথাও বেশ খারাপই বলা চলে। ঢাকা থেকেই এই পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত তুমি যখন নেত্রকোনায় পৌঁছুলে যখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সেখান থেকে একটি নৌকা ভাড়া করে যখন হাওরের দিকে যাত্রা শুরু করবে তখন ক্লান্তি যতোই জেকে ধরুক না কেনো, ঘুমিয়ে পড়া যাবে না কোনোভাবেই। বিকেলের আলোয় পৃথিবীটা তখন সবসময়ের চেয়ে একটু বেশিই সুন্দর লাগে। তবে তখনও তুমি হাওড় থেকে অনেক দুরে। কখনও গলুইয়ে আবার কখনও ছইয়ের নিচে বসে দেখতে পাবে নানান রকম পাখি। বক, হাড়ি চাচা, আর মাছরাঙ্গা দেখতে পাবে সবচে বেশি। তবে নৌকা যদি তীর ঘেসে যায় তাহলে হয়তো চোখে পড়তেই পারে কোনো গাছে ছোট্ট কাঠঠোকরা ঠুক ঠুক করে বাড়ি বানাচ্ছে এমন কোনো দৃশ্য। সন্ধ্যার পর থেকে শুধু শব্দ শুনেই কাটিয়ে দিতে পারো পুরোটা রাত। দূরে কোথাও কোথাও আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে? ওগুলো নিশ্চিৎ মাছ ধরার নৌকা। রাত জেগে মাছ ধরে জেলেরা এখানে। নৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দের সঙ্গে শুনতে পাবে রাতের পাখির ডাকাডাকি আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার গান। রাতের খাবার চলন্ত নৌকাতেই তৈরি হবে। এটাও নিশ্চয়ই তোমার কাছে নতুন। তবে একটা ছোট্ট চুলায় রান্নার ব্যবস্থা নৌকাতে থাকেই।
দ্বিতীয় দিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে যা দেখবে, তা দেখার জন্য তোমার তৈরি না থাকারই কথা। অনেক ভোরে পাখির ডাকাডাকি তোমাকে আর এক মিনিটও ঘুমাতে দেবে না। কিচির মিচির শব্দে নৌকার ছই থেকে মাথা বের করেই হঠাৎ তোমার মনে হতে পাওে যে, এ আমি কোথায় এলাম! কারণ তখন তুমি হাওড়ে। যতোদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। এর মধ্যেই ফুটে আছে অসংখ্য ফুল। আবার এই শাপলা শালুক ফুলের উপরেই ঘুরে বেড়াতে দেখবে নানা রঙ্গের ফড়িং। এ ফুল থেকে সে ফুলে উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো ঐ দুষ্টু ফড়িংগুলো কিন্তু বড্ড অস্থির। এদের যদি দেখতে থাকো, তবে কিন্তু আরো কিছু দেখা বাকী থেকে যাবে। কারণ ঠিক সেই মুহূর্তেই আবার তোমার খুব কাছে না হলেও, কাছাকাছি কোনো জায়গায় পানি থেকে ভুস করে মাথা তুলে সাঁতার কাটতে দেখবে কালো কালো পানকৌড়িদের। ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখবে হঠাৎ করেই যেনো আবার কোথায় ওরা হারিয়ে গেছে। আসলে ওরা এই সময়টাতে আবারও পানিতে ডুব দিয়েছে মাছ ধরবে বলে। আর এই সব সুন্দর দৃশ্যের মাঝ দিয়েই পানি বেয়ে এগিয়ে চলেছে তোমার নৌকা।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলেই দেখতে পাবে সাদা বকের ঝাঁক। একটু পর পরই বকের ঝাঁক চক্রাকারে ঘুরে যাবে তোমার মাথার উপর দিয়ে। তারপর আবার চলে যাবে দূর অজানায়। মানে ঠিক অজানা নয়, ওরা চলে যাবে ওদের বাসার দিকে। এরই মাঝে যখন চারপাশে হলুদ আভা ছড়িয়ে দিয়ে যখন সূর্য ডুবে যাবে সেই সময় তোমার মনে হবে এই জায়গা ছেড়ে কোথাও যাবো না। এতোই সুন্দর সেই দৃশ্য।
পরেরদিন সকালে নৌকাটা যে কোন গ্রামের দিকে চলে এসেছে, তা তুমি মোটে বলতেই পারবে না। কারণ, খুব ভোরে নৌকা নিয়ে রওনা হয়ে যাবে মাঝিরা, যখন তুমি গভীর ঘুমে। চোখ মেলে তুমি দেখবে চারপাশ শুধু সবুজ। একটি মজার জিনিসের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারো ভাগ্য ভালো থাকলে। তা হলো কাকতাড়ুয়া। মাটির হাড়ির মাথাওয়ালা রঙ্গীন কাকতাড়–য়াগুলো নানা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। তুমি চাইলেই নৌকা থেকে নেমে একটু দৌড়ে আসতে পারো ধানের ক্ষেতের মাঝে। আর দৌড়ানোর সময় তোমার হাতদুটো দু’দিকে মেলে ধরলেই দেখবে উপরের নীল আকাশের দু’পাখা মেলে ধরা চিলের সঙ্গে কেমন যেনো মিলে গিয়েছো তুমি। ধান ক্ষেতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়–য়াগুলো সঙ্গে ছবিও তুলতে পারো। তোমার ভাগ্যে যদি ভালো থাকে তাহলে হাওড়ে বৃষ্টি দেখতে পাবে। কী যে সুন্দর লাগে তখন চারপাশটা। যতদুর দেখা যায় ততদুর পর্যন্ত বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনেছো হয়তো কিন্তু পানিতে বৃষ্টির শব্দ তুমি না শুনলে বুঝতে পারবে না ব্যাপারটা কেমন।
যাত্রা শেষে তুমি চলে এসেছো সিলেটের সুনামগঞ্জে। সেখান থেকে তুমি একটি সাধারণ বাসে সিলেট শহরে চলে আসতে পারো। খরচ খুবই কম। তারপর চেপে বসতে পারো ট্রেনে। ঝিকঝিক শব্দে তুমি পৌঁছে যাবে এই শহরে। বাড়ি ফেরার কথা ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে? কিন্তু বাড়ি যে ফিরতেই হবে। বাড়ির যারা যায়নি আর তোমার সব বন্ধুরা অপেক্ষা করে আছে, নৌভ্রমণের গল্প শোনার জন্য।
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/তৃষা/এসএ/এইচআর/আগস্ট ১২/১০








