Main Story
দেশে দেশে ক্রিসমাস
অদ্বিতী ডি কস্তা

শেষ পর্যন্ত ক্রিসমাস কিন্তু কাছেই চলে আসলো। নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের সব প্রস্তুতি শেষ করে ফেলেছো। ক্রিসমাস খ্রিষ্টানদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান। আর সারা বিশ্বে ডিসেম্বর মাস শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় ক্রিসমাসের প্রস্তুতি। পৃথিবীর একেক দেশে ক্রিসমাস একেকভাবে পালিত হয়। চলো আমরা পৃথিবীর ১০টি দেশের ক্রিসমাসের আয়োজন দেখে আসি।

বেলজিয়াম

বেলজিয়ামে ডিসেম্বরের ৬ তারিখ ‘সিন্টারক্লজ বা সেইন্ট নিকোলাস’ নামের একটি অনুষ্ঠান উদযাপন করা হয়। এটি ক্রিসমাস থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অনুষ্ঠান। সান্তা ক্লজকে বেলজিয়ামে বলা হয় ‘কেরস্টম্যান’ বা ‘লি পেরে নোয়েল’। এ দিনে সান্তা বেলজিয়ামের তোমাদের মতো ছোটদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন।

এছাড়াও বড়দিন ঊপলক্ষে বাবা মায়েরা বাচ্চাদেরকে নানা ধরণের উপহার দিয়ে থাকেন। ক্রিসমাস ট্রির নিচে, স্টকিং বা মোজায় তারা এই উপহার দিয়ে থাকেন। বেলজিয়ামে সব্বাই বড়দিনে নাস্তা করার জন্য এক ধরনের মিষ্টি রুটি খেয়ে থাকে। আর এই রুটির আকৃতি হয় শিশু যিশু খ্রিস্টের মতো। আর তাছাড়া সব পরিবারই উৎসব উপলক্ষে বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে থাকে। 

ব্রাজিল

ব্রাজিলে সান্তা ক্লজকে পাপাই নোয়েল বলে ডাকা হয়। ব্রাজিল, আমেরিকা মহাদেশের একটি দেশ। আর তাই এদের আচার অনুষ্ঠানের অনেকটাই আমেরিকার সঙ্গে মিলে যায়। ব্রাজিলে যারা একটু বেশি ধনী, তারা ক্রিসমাসে খাবারের তালিকায় মুরগি, টার্কি সহ বিভিন্ন স্বাদু খাবারের আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও চকোলেট আর কনডেন্সড মিল্কের মিশ্রণে তৈরি মিষ্টিও থাকে। এর নাম ব্রিগেডেইরো। ব্রাজিলের সকল বাসিন্দাই ক্রিসমাস উপলক্ষে ক্রিসমাস ট্রি সাজিয়ে থাকে। ব্রাজিলে কিন্তু বরফ পড়ে না। আর তাই তারা ক্রিসমাস ট্রির উপরে তুলো দিয়ে বরফ বানায়।

ফ্রান্স

ফ্রান্সে ক্রিসমাসকে বলা হয় নোয়েল। আর ক্রিসমাস ফাদার বা সান্তা ক্লজকে বলা হয় পেরি নোয়েল। ফ্রান্সের সবাই ক্রিসমাস ট্রিকে পুরোনো ধাঁচের সাজে সাজাতেই বেশি ভালোবাসে। তারা তাদের ট্রির উপরে লাল রঙের রিবন মুড়িয়ে তার সঙ্গে সাদা মোম বাতি দিয়ে ক্রিসমাস ট্রি  সাজায়। এছাড়াও কারো বাগানে যদি ফার গাছ থাকে তাহলে ছোট ছোট বাল্ব লাগিয়ে তারা সেগুলোকেও রঙীন করে তোলে। ফ্রান্সের সবাই ক্রিসমাসের রাতের খাবারটি পরিবারের সঙ্গেই খেয়ে থাকে।

নিউজিল্যান্ড

নিউজিল্যান্ডে ক্রিসমাসের দিনটি শুরু হয় ক্রিসমাস ট্রির নিচে রাখা উপহারের প্যাকেট খোলা দিয়ে। এর পর ক্রিসমাসের দুপুরের খাবার পরিবারের সবাই একসঙ্গেই খেয়ে থাকে। টার্কি আর মুরগীর মাংস দিয়েই চলে খাওয়ার পর্ব। এরপর শুরু হয় চা পানের আসর। আর রাতে পরিবার আর বন্ধুদের সঙ্গে চলে বার-বি-কিউ পার্টি।

পর্তুগাল

পর্তুগালেও ক্রিসমাসের অন্যতম আকর্ষণ হলো ক্রিসমাস ফাদারের আনা উপহার। ক্রিসমাসের আগের দিন সন্ধ্যায় অর্থাৎ ক্রিসমাস ইভ এ ক্রিসমাস ট্রির নিচে বা চিমনির সামনে ঝোলানো মোজার মধ্যে ক্রিসমাস ফাদার উপহার দিয়ে যান। আর ক্রিসমাস ইভ এ মাঝ রাতে সিদ্ধ আলু আর নোনতা শুকনো কড মাছ দিয়ে তারা ক্রিসমাসের ভোজ সেরে থাকে।

জার্মানি

জার্মানরা ক্রিসমাস উপলক্ষে তাদের ঘর সাজাতেই বেশি ভালোবাসে। জার্মানে ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে খুবই সুন্দর সুন্দর জিনিস ব্যবহার করা হয়। তারা তাদের জানালায় কাঠের ফ্রেমে ইলেক্ট্রিক মোমবাতি জ্বালিয়ে তার সামনে কাগজের বা প্লাস্টিকের রঙবেরঙের ছবি টানিয়ে দেয় যা রাতের বেলা বাইরে থেকে দেখতে খুবই সুন্দর লাগে। এছাড়াও জার্মানরা যেখানে যিশু খ্রিস্ট জন্ম গ্রহণ করেছিলেন সেই গোশালার মতো করে ঘর তৈরি করে থাকে। এর ভিতরে যোসেফ এবং মেরির কোলে শিশু যিশুর প্রতিকৃতি থাকে। আরো থাকে তিন পণ্ডিত, রাখাল, ভেড়া, গরু আদলে বানানো প্রতিকৃতি।

জার্মানির বাসিন্দারা ক্রিসমাস ইভ এ অর্থাৎ ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় গির্জার উপাসনা শেষে বাড়ি ফিরলে দেখতে পায় ক্রিসমাস ফাদার তাদের ক্রিসমাস ট্রির নিচে উপহার দিয়ে গেছেন। আর একজন সদস্য একটি বেল বাজিয়ে ঘরের সকলকে এ উপহার দেখার আহ্বান জানায়। ’

রাশিয়া

এবারে একটা মজার বিষয় শোনো। পুরো পৃথিবীতে ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাস পালন করা হলেও রাশিয়ায় কিন্তু ক্রিসমাস পালিত হয় ৭ জানুয়ারি। এর কারণ হলো রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরোনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে থাকেন। কেউ চাইলে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করতে পারে। তবে সবাই ৭ জানুয়ারিতেই বড়দিন পালন করে থাকে। মূলত রাশিয়ায় ক্রিসমাসের চাইতে নববর্ষকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে।

সুইডেন

সুইডেনে ক্রিসমাস আয়োজনে অন্যতম দিন হলো ক্রিসমাস ইভ। ক্রিসমাসে সুইডেনবাসীরা একে অপরকে উপহার দিয়ে আর ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানিয়েই উদযাপন করে থাকেন। এছাড়াও ক্রিসমাসের দিন অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর সকাল সকাল তারা সবাই চার্চে মিলিত হন।

আমেরিকা

তোমরা তো জানোই আমেরিকা বিশাল বড় দেশ। আর তাই এ দেশে বৈচিত্র্যও বেশি। আমেরিকায় ক্রিসমাসের আগের চারটি সপ্তাহকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। এ চার সপ্তাহ জুড়েই তারা বড়দিনের প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে আমেরিকানরাও জার্মানদের মতই সরেস। আমেরিকান বাবা মায়েরা তো সারা বছর বাচ্চাদেরকে লক্ষী হয়ে থাকতে বলে। যদি তারা লক্ষী হয়ে না থাকে তাহলে ক্রিসমাসের আগে তাদের স্টকিং এ ভালো উপহার পাবে না। আর তাই ক্রিসমাসের আগের দিন সব বাচ্চারা সুন্দর সুন্দর স্টকিংস ঝুলিয়ে রাখে যেখানে সান্তা উপহার রেখে যাবেন। আর এরপর তারা সকালে উঠে উপহার পাবার লোভে জলদি জলদি ঘুমাতে চলে যায়। তারা বিশ্বাস করে সান্তা তার ছয়টি রেইন ডিয়ারে টানা গাড়িতে চড়ে বিশাল ঝোলা ভর্তি চকোলেট, ক্যান্ডি আর উপহার নিয়ে এসে তাদের স্টকিং আর ক্রিসমাস ট্রির নিচে রেখে যাবেন।

 

ফিনল্যান্ড

ফিনল্যান্ডের অধিবাসীরা মনে করে সান্তা থাকেন ফিনল্যান্ডের উত্তর দিকের কর্ভটুন্টুরি নামের একটা জায়গায়। তারা বড়দিন উপলক্ষে তাদের ঘরবাড়ি ধুয়ে মুছে ঝকঝকে তকতকে করে তোলে। ক্রিসমাস ইভ, ক্রিসমাস আর বক্সিং ডে এ তিনটি দিন তারা বিশেষভাবে পালন করে থাকে। ক্রিসমাস ইভ এ তারা ভাত, নানা ফলের মিশ্রণে তৈরি একপ্রকার মিষ্টি স্যুপ খেয়ে থাকে। এরপর তারা নিজের ঘরে ক্রিসমাস ট্রি সাজাতে বসে। ফিনল্যান্ডে ক্রিসমাসের অন্যতম আকর্ষণ হলো- দিনের মাঝামাঝি সময়ে ক্রিসমাসের শান্তির বার্তা টিভি আর রেডিওতে প্রচারিত হয়।
ক্রিসমাসে ফিনল্যান্ডের শিশুরাও ক্রিসমাস ফাদারের কাছ থেকে উপহার পেয়ে থাকে। পরিবারের যেকোনো একজন বড় সদস্য সান্তা ক্লজের পোশাক পড়ে তাদের উপহার দিয়ে থাকেন।


 

বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/অদ্বিতী/এসএ/সাগর/এইচআর/ডিসেম্বর ২০/১০