Main Story
আমাদের লাল-সবুজের পতাকা
ঋতি
আচ্ছা, যখন বিশ্বকাপ ফুটবল কিংবা বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা হয় তখন সবচেয়ে মজার বিষয়টা কি বলো তো ? আমাদের দেশটা অনেক সুন্দর করে সেজে ওঠে, তাই না? কি দিয়ে সাজে? ঠিক ধরেছো, দেশটা পতাকা দিয়ে সেজে বসে থাকে। ছোট, বড়ো, হরেক রকমের পতাকা। বিভিন্ন রঙের, বিভিন্ন দেশের পতাকা। সব দেশেরই একটা নিজস্ব পতাকা আছে, যা ঐ দেশের স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব আর নিজস্বতাকে তুলে ধরে। আমাদের দেশের পতাকা তো নিশ্চয়ই চেনো। অনেকে তো আবার বিশ্বকাপের সময় আমাদের একটা পতাকাই বানিয়ে নিয়েছিলে, কিংবা কিনেছিলে। আর তারপর সেটা মাথায় বেঁধে কিংবা ঘরের জানালায় পরম মমতায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলে।

চিত্রশিল্পী ‘কামর“ল হাসানের’ নাম নিশ্চয়ই তোমরা সবাই শুনেছো? উনিই কিন্তু আমাদের দেশের এই সুন্দর পতাকার নকশা করেছেন। আর আমাদের সবার প্রিয় এই পতাকা প্রথম জনসম্মুখে উত্তোলন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভি.পি. আ স ম আব্দুর রব । ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলাতে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। আর আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাসভবনে প্রথম এই পতাকা উত্তোলন করেন ২৩ মার্চ, ১৯৭১।

আমাদের পতাকার রঙ হলো লাল ও সবুজ। গাঢ় সবুজ রঙ বাংলাদেশের সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির রূপকে প্রকাশ করে, আর রক্তের মতো লাল রং ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের কালো হাত থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে লাখো মানুষের শহীদ হওয়ার সাক্ষ্য বহন করে। আবার এই গোল লাল রঙের অংশটি উদীয়মান সূর্যকেও বোঝায়। অর্থাৎ, আমাদের সবুজ স্বদেশের বুকে উঠছে নতুন এক সূর্য, যে সূর্য কেবলই উঠছে, এখনো লাল হয়ে আছে। তোমরা ভোরবেলা উঠে কখনো সূর্যোদয় দেখেছো? তখন দেখবে, সূর্যটা কেমন টকটকে লাল হয়ে থাকে। ঠিক আমাদের পতাকার লাল বৃত্তের মতো।
তবে তোমরা এখন যে পতাকাটি দেখো, আমাদের প্রথম জাতীয় পতাকার নকশাটি কিন্তু পুরোপুরি একরকম ছিলো না। সেখানে আয়তাকার সবুজ জমিনের বুকে লাল বৃত্ত ঠিকই ছিলো। তবে সেই বৃত্তের মধ্যে আরো ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের সোনালী রঙের একটা মানচিত্র। কিন্তু পরে পতাকাটা আরো সহজ করার জন্য পতাকা থেকে মানচিত্রটা বাদ দেয়া হয়। তুমিই বলো, আমাদের পতাকার মাঝখানে যদি এখনো ওই মানচিত্রটা থাকতো, তবে কী আর তুমি আমি এতো সহজে আমাদের জাতীয় পতাকা আঁকতে পারতাম? আর নিজের দেশের জাতীয় পতাকা আঁকতে না পারার চেয়ে বড়ো লজ্জার আর কী হতে পারে! পরে ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি সরকারিভাবে আমাদের জাতীয় পতাকা গৃহীত হয়।

তোমাদের জামা-কাপড় তৈরীর সময় কিন্তু মাপ নেয়া হয়, যাতে জামাটা তোমার গায়ে ঠিকমতো হয়, আর জামা পরার পরে তোমাকে দেখতেও সুন্দর লাগে। ঠিক তেমনি, আমাদের পতাকার জন্যও কিন্তু একটা নির্দিষ্ট মাপ আছে। আমাদের জাতীয় পতাকার দৈর্ঘ্য আর প্রস্থের অনুপাত হলো ১০ : ৬। আর যে লাল বৃত্তটা আঁকা হয়, সেটার ব্যাসার্ধ হবে দৈর্ঘ্যরে ৫ ভাগের ১ ভাগ। দৈর্ঘ্যরে ২০ ভাগের ৯ ভাগ দিয়ে আর প্রস্থের মাঝ বরাবর বিন্দু দিয়ে দুইটা লম্বা রেখা টানলে তারা যে বিন্দুতে ছেদ করে, সেই বিন্দুটাই হয় বৃত্তটার কেন্দ্র বিন্দু। যাকে ঘিরে বৃত্তটা আঁকা হয় আরকি।

পতাকা যেহেতু একটা দেশের স্বাধীনতার প্রতীক, তাই এর সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত, কী বলো? অনেকেরই ধারণা যে সবুজ রঙটা ইসলামের সবুজ রঙকে প্রকাশ করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের পতাকার সবুজ রঙ কোন ধর্মকে নয় বরং জাতি-ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে, নিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রকাশ করে। আমাদের দেশ যেমন সবুজ, আমাদের দেশের জাতীয় পতাকাও তেমনি সবুজ।

তোমরা সবাই তো অনেক লক্ষী, তাই না ? তাই আজ তোমরা এটাও জেনে নাও যে, কিভাবে পতাকার সম্মান রক্ষা করতে হয়। আর কিভাবেই বা এর ব্যবহার করতে হয়। প্রতিদিনই বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। আর পতাকা উত্তোলনের সময় হলো সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। অর্থাৎ পতাকা উত্তোলন করতে হবে ঠিক সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে, বা খুব ভোরবেলায়। আর পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই, একদম দেরি করা যাবে না। আমাদের ভালোবাসার পতাকা কি আর অন্ধকারে বাতাসে দোল খাবে? তবে গাড়ি কিংবা প্লেনে বা যদি রাষ্ট্রপতি বা মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বা এই ধরনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু হয়, তাহলে পতাকা রাতেও উত্তোলিত থাকতে পারে। আবার কিছু বিশেষ দিনে শোক প্রকাশ করতে পতাকা অর্ধনমিত রাখতে হয়। অর্থাৎ পতাকা পুরোপুরি না তুলে অর্ধেক তুলতে হয়। তবে এক্ষেত্রে মনে রেখো- পতাকা কিন্তু প্রথমে পুরোপুরিই উত্তোলিত করতে হবে। তারপরে অর্ধেক নিচে নামাতে হবে।

আমরা যেমন আমাদের মাকে খুব ভালোবাসি, তেমনি আমাদের মাতৃভূমি আর আমাদের জাতীয় পতাকাকেও খুব করে ভালোবাসতে হবে। এর সম্মান বজায় রাখতে হবে। কখনোই কোনো পতাকাকে মাটিতে পড়তে দেয়া যাবে না। পতাকাতে কোনো মন্তব্য বা কোনো দাগও দেয়া যাবে না। এমনকি পতাকাকে যেমন-তেমনভাবে ঝুলিয়ে বা অন্য কোনোভাবেও রাখা যাবে না। সবসময় উঁচুতে, সোজাভাবে এবং মুক্তভাবে উড়তে পারে এমনভাবে উত্তোলন করতে হবে। দুটি পতাকা পাশাপাশি থাকলে অবশ্যই আমাদের বাংলাদেশের পতাকাকে ডান দিকে রাখতে হবে। যদি অনেকগুলো পতাকা থাকে আর যদি সেটা বিজোড় সংখ্যক হয়, তাহলে আমাদের পতাকা থাকবে ঠিক মাঝখানে। কখোনোই অন্য কোনো পতাকাকে বাংলাদেশের পতাকার চেয়ে উঁচুতে উড়তে দেয়া যাবে না। তবে তুমি যদি অন্য কোনো দেশে যাও, তখন আবার সেই দেশের পতাকাকে এই মর্যাদা দিতে হবে। কারণ, ওটা ওদের জাতীয় পতাকা। সব দেশের জাতীয় পতাকাই সমান সম্মান পাওয়ার যোগ্য। আবার বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের জন্য পতাকার

কিন্তু কতোগুলো আলাদা আলাদা মাপ রয়েছে। যেমন তোমার পতাকার দৈর্ঘ্য যদি হয় ৩০৫ সেমি, তাহলে প্রস্থ হবে ১৮৩ সেমি। এমনি আরো কয়েকটা মাপ হলো- ১৫২ সেমি  ৯১ সেমি, ৭৬ সেমি  ৪৬ সেমি। তোমার বাসায় পতাকা লাগানোর সময় কিন্তু মাপগুলোর কথা মাথায় রেখো। আর যাদের গাড়ি আছে, তারা নিশ্চয়ই ভাবছো, গাড়িতে কিভাবে লাগাবে? যানবাহনের জন্যও এমনি পতাকার কয়েকটা মাপ আছে। তোমার গাড়ির আকার অনুযায়ী তোমাকে পতাকা লাগাতে হবে। ছোটো গাড়িতে কিন্তু ছোটো সাইজের পতাকাই লাগাতে হবে। মাপগুলো হলো- ৩৮ সেমি  ২৩ সেমি আর ২৫ সেমি  ১৫ সেমি। বিশেষ দিনে যে কেউই তাদের  গাড়িতে পতাকা উড়ায়। তবে অন্য সময় কিন্তু কমপক্ষে পূর্ণ মন্ত্রী বা তার সম মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তির গাড়িতেই শুধু পতাকা উড়ানো যায়।

আমাদের বাংলাদেশ কিন্তু এমনি এমনি স্বাধীন হয়নি। এর জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। তারা তাদের জীবন দিয়ে গেছেন আমাদের এই দেশের জন্য, এই মাটির জন্য, আমাদের জাতীয় পতাকার জন্য। আমাদের যাতে নিজেদের একটা দেশ থাকে, নিজেদের একটা পরিচয় থাকে, নিজেদের একটা জাতীয় পতাকা থাকে। আমরা যাতে বলতি পারি, বাংলাদেশ আমাদের দেশ, আর এই লাল-সবুজের জাতীয় পতাকাটাও আমাদের। তাদের সেই আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে, আমাদের দেশকে ভালোবেসে, আমাদের সবার উচিত আমাদের দেশ- বাংলাদেশ, আমাদের ইতিহাস, আমাদের লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা- সবকিছু সম্পর্কে ভালোভাবে জানা। আমাদের জাতীয় পতাকাকে সম্মান করা, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে সম্মান করা। আমাদের জাতীয় পতাকার যেন কখনো কোনো অসম্মান না হয়। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত বাজলে কেউ যেন বসে না থাকে। তোমরা তো অনেক লক্ষী, তোমরা নিশ্চয়ই আমাদের পতাকাকে, আমাদের জাতীয় পতাকাকে সবসময় সম্মান দেবে, আর অনেক ভালোবাসবে। নাহলে, যারা আমাদের জন্য শহীদ গেলেন, তাদেরকে কী জবাব দেবে, বলো?





বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/ঋতি/এনজে/এসএ/এইচআর/মার্চ ৩১/১১