Main Story
রবি কবির 'ছেলেবেলা'
রাশেদ শাওন

বাংলা ভাষার একমাত্র নোবেল জয়ী সাহিত্যিক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার সুবিশাল সাহিত্য সম্ভার থেকে কিছু না কিছু নিশ্চয়ই পড়েছো তোমরা। এই কিংবদন্তীর মানুষটি ছেলেবেলায় কিন্তু তোমাদের মতোই ছিলেন। তাঁর লেখা বই ‘ছেলেবেলা’ থেকে অনেকটাই ধারণা পাওয়া যায়। সেই বইয়ের আকর্ষণীয় কিছু অংশ নিয়ে তৈরি হয়েছে এই রচনাটি।

রবি’র শহর কলকাতা
এই মানুষটির জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। জন্মস্থান সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি জন্ম নিয়েছিলুম সেকেলে কলকাতায়। শহরে শ্যাকরাগাড়ি ছুটছে তখন ছড়্ছড়্ করে ধুলো উড়িয়ে, দড়ির চাবুক পড়ছে হাঁড়-বের করা ঘোড়ার পিঠে। না ছিল ট্রাম , না ছিল বাস , না ছিল মোটরগাড়ি । তখন কাজের এত বেশি হাঁসফাঁসানি ছিল না , রয়ে বসে দিন চলত। বাবুরা আপিসে যেতেন কষে তামাক টেনে নিয়ে পান চিবতে চিবতে , কেউ বা পালকি চড়ে কেউ বা ভাগের গাড়িতে।’

রবি’র লেখা বর্ণনা পড়তে পড়তে এতক্ষণে নিশ্চয় সেই সময়ের কলকাতা একটা ছবি মনে মনে এঁকে ফেলেছো। এবারে বলছি তাঁর পরিবারের কথা। দার্শনিক এই মহাপুরুষের জন্ম ১৮৬১ সালে। তাঁর পিতা ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মা সারদাসুন্দরী দেবী। তিনি তাঁর বাবা-মায়ের ১৪তম সন্তান। বাবার ছিলো ভ্রমণের নেশা। আর কবি’র মায়ের মৃত্যু হয় ১৯০৫ সালে কবির বয়স যখন মাত্র ১৪ বছর। তাই বলা যায় তিনি বড় হয়েছিলেন ভাই-ভাবি আর বাড়ির ভৃত্যদের কাছে।

পড়ায় সময় ঘুম আর ঘুমের সময় ‘গপ্প’
খুব ছোটবেলা থেকেই শিক্ষাপর্ব শুরু হয়েছিলো তার। রবির মতো উজ্জ্বল যার মেধা তিনি কিন্তু পড়ালেখায় তেমন মনোযোগী ছিলেন না। তোমাদের কারো কারো যেমন পড়তে বসলেই ঘুম পায় এই মানুষটিরও তেমনি পড়তে বসলেই ঘুম পেতো। তিনি এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘মাস্টারমশায় মিটমিটে আলোয় পড়াতেন প্যারী সরকারের ফার্স্টবুক। প্রথমে উঠত হাই, তার পর আসত ঘুম, তার পর চলত চোখ-রগড়ানি।‘ সেই পড়ার আসরে তারই সহপাঠী সতীনেরও ঘুম পেতো। সে অবশ্য ভালো ছেলেটি হয়ে ঘুম তাড়ানোর জন্য চোখে নস্যি ঘষতো। আর রবীন্দ্রনাথ রাত নয়টা বাজতে না বাজতেই ঘুমের ঘোরে ঢুলু ঢুলু চোখে মায়ের কাছে যেতেন। বাহির বাড়িতে পড়তে বসেন তিনি। ভিতর বাড়িতে যাওযার সময় সরু পথে ছিলো ভূতের ভয়। এটা মনে করে তার পিঠ উঠতো শিউরে। সে সময় নাকি ভূত প্রেত ছিল গল্পে-গুজবে। এমন কী মানুষের মনের আনাচে-কানাচেও ছিলো তাদের আনাগোনা।

মায়ের কাছে গেলে সেই ঘুম কোথায় পালিয়ে যেত! নেশা ছিলো ভূতের গল্প শোনার। এজন্য ভূতের ভয় শিরদাঁড়ার উপর চাপিয়ে যখনই যেতেন বাড়ির ভিতরে, মায়ের ঘরে। সেখানে গিয়েও মায়ের সঙ্গে শুরু করতেন দস্যিপনা। মা বিরক্তি নিয়ে বলতেন, ‘জ্বালাতন করলে, যাও খুড়ি, ওদের গল্প শোনাও গে।' এরপর বাইরের বারান্দায় ঘটির জলে পা ধুয়ে দিদিমাকে টেনে নিয়ে বিছানায় উঠতেন। সেখানে শুরু হতো দৈত্যপুরী থেকে রাজকন্যার ঘুম ভাঙিয়ে আনার পালা। রাজকন্যা যখন রাজপুত্রের ঘোড়ায় উঠে বসবে ঠিক তখনই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেত ছোট্ট রবি।

আট বেহারার পালকি চেপে মেলতো মনের পাখনা
সেই বাড়িতে একটা পালকি ছিলো তার দাদার আমলের। সেই পালকির কী বহর! কবিগুরু ভাষায়, ‘পালকিখানা ঠাকুরমাদের আমলের। খুব দরাজ বহর তার, নবাবি ছাঁদের। ডান্ডা দুটো আট আট জন বেহারার কাঁধের মাপের। হাতে সোনার কাঁকন কানে মোটা মাকড়ি, গায়ে লালরঙের হাতকাটা মেরজাই-পরা বেহারার দল সূর্য-ডোবার রঙিন মেঘের মতো সাবেক ধনদৌলতের সঙ্গে সঙ্গে গেছে মিলিয়ে। এই পালকির গায়ে ছিল রঙিন লাইনে আঁকজোক কাটা, কতক তার গেছে ক্ষয়ে, দাগ ধরেছে যেখানে সেখানে, নারকোলের ছোবরা বেরিয়ে পড়েছে ভিতরের গদি থেকে। এ যেন একালের নামকাটা আসবাব, পড়ে আছে খাজাঞ্চিখানার বারান্দায় এক কোণে। আমার বয়স তখন সাত-আট বছর। এ সংসারে কোনো দরকারি কাজে আমার হাত ছিল না; আর ঐ পুরানো পালকিটাকেও সকল দরকারের কাজ থেকে বরখাস্ত করে দেওয়া হয়েছে। এইজন্যেই ওর উপরে আমার এতটা মনের টান ছিল। ও যেন সমুদ্রের মাঝখানে দ্বীপ, আর আমি ছুটির দিনের রবিন্সন্-ক্রুসো, বন্ধ দরজার মধ্যে ঠিকানা হারিয়ে চারদিকের নজরবন্দি এড়িয়ে বসে আছি।’

যেদিন পড়াশুনায় থাকতো ছুটি সেদিন তিনি গিয়ে পালকিতে গিয়ে ঢুকতেন সবার অগোচরে। তারপরে ছুটিয়ে দিতেন তাঁর কল্পনার পক্সখীরাজ ঘোড়া। দিনটা এই পালকিতে বসেই পার হতো তাঁর। তখন কত কী যে ভাবতেন তিনি, যেমন তোমাদের মনের মধ্যেই ভাবনার জাল বুনে তের নদী সাত সমুদ্র সমান। ‘চলেছে মনের মধ্যে আমার অচল পালকি, হাওয়ায় তৈরি বেহারাগুলো আমার মনের নিমক খেয়ে মানুষ। চলার পথটা কাটা হয়েছে আমারই খেয়ালে। সেই পথে চলেছে পালকি দূরে দূরে দেশে দেশে, সে-সব দেশের বইপড়া নাম আমারই লাগিয়ে দেওয়া । কখনো বা তার পথটা ঢুকে পড়ে ঘন বনের ভিতর দিয়ে। বাঘের চোখ জ্বল্জ্বল্ করছে , গা করছে ছম্ছম্। সঙ্গে আছে বিশ্বনাথ শিকারী, বন্দুক ছুটল দুম, ব্যাস্ সব চুপ।’

এরপর রবির পালকির চেহারা যেত বদলে। সেটা তখন ময়ূরপক্সখী, ভেসে চলে সমুদ্রে, ডাঙা যায় না দেখা তা। নাওয়ের দাঁড় পড়তে থাকে ছপ্ছপ্, ঢেউ উঠতে থাকে দুলে দুলে ফুলে ফুলে। কানে এস লাগে মাল্লার ডাক, ‘সামাল সামাল, ঝড় উঠল।’ তখন হাল ধরেন আবদুল মাঝি। এই মাঝিটি ছিলো তার দাদার ভক্ত। তার ছিলো দাড়ি ছুঁচলো, তবে গোঁফ তার কামানো, মাথাও ন্যাড়া। রবি তাকে চিনেছিলেন, সে দাদাকে পদ্মার ইলিশমাছ আর কচ্ছপের ডিম এনে দিত বলে। এখানেই থামতো না সেই বায়স্কোপের মতো পালকি। কবির আরো ছোটবেলায় শোনা নানান কিচ্ছা কাহিনী যেন জীবন্ত হয়ে উঠতো পালকির ভেতরের আলো ছায়ায়।

মন ছিলো না খাওয়ায় আর পড়ায়
ছোটবেলায় রবির স্বাস্থ্য ছিলো বেশ। তিনি পরিমাণে কম খেতেন। খাবার নিয়ে তোমাদের মতো এতো বাছ-বিচারও ছিলো না তার। তবুও তিনি কখনো কাহিল হননি। তার সমবয়সীরা যারা অনেক খেতো, তাদের চেয়ে রবির গায়ে জোর ছিলো ঢের বেশি। তিনি তার স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে  লিখেছেন, ‘শরীর এত বিশ্রী রকমের ভালো ছিল যে, ইস্কুল পালাবার ঝোঁক যখন হয়রান করে দিত তখনও শরীরে কোনোরকম জুলুমের জোরেও ব্যামো ঘটাতে পারতুম না।’ এই বাক্য পড়ে হয়তো ভাবছো তাহলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো এমন একজন গুণীজনও স্কুল পালাতেন নাকি? হুম্ একদম ঠিক কথা। স্কুলে তার মন ছিলো না। আর যাতে স্কুল না যেতে হয়, সেজন্য মাঝেমাঝেই স্কুলের জুতো ভিজাতেন পানিতে আর ভিজা জুতা নিয়েই সারাদিন ঘুরতেন যাতে সর্দি লাগে রাতে। এছাড়া চুল জামা ভেজানোর জন্য কার্তিক মাসে খোলা ছাদে শুয়ে থেকেছেন কত, যাতে গলায় একটু খুসখুসানি কাশি হয়। আবার পেট-কামড়ানি বা বদহজমের জন্য তাগিদ অনুভব করলেও সেটা বুঝতেও পারে নি তার পেটে। এতে তিনি রণেভঙ্গ দেন নি। বরং কোনদিন ছুটির তাদাগা অনুভব করলেই মায়ের আঁচলের নিচে গিয়ে লুকাতেন। তার মাও ছিলেন পক্ষে। এখনকার মায়েদের মতো গোল করতেন না ছেলের সঙ্গে। বরং তিনি ছেলের হয়ে কাউকে ডেকে বলতেন, ‘আচ্ছা যা, মাস্টারকে জানিয়ে দে, আজ আর পড়াতে হবে না।'

মন পড়ে থাকতো বড়দের কাজে
ঠাকুরবাড়িতে নাটক যাত্রা হতো নিয়মিত। তবে সেসব শুধু ছিলো বড়দের জন্য। এখন তোমরাও যেমন বড়দের কোনো কিছু করতে দেখলে সেই কাজটিই করার জন্য মনে মনে উদগ্রীব হয়ে যাও, তিনিও তখন তোমারই সমমনা ছিলেন। সেই কথাটিও জানাতে ভুল করেন নি তিনি। ‘কী আর বলব, আমরা সে-সময়ে ছিলুম ছেলেমানুষ। তখন বড়োদের আমোদে ছেলেরা দূর থেকেও ভাগ বসাতে পেত না । যদি সাহস করে কাছাকাছি যেতুম তা হলে শুনতে হত ‘যাও খেলা কর গে', অথচ ছেলেরা খেলায় যদি উচিতমতো গোল করত তা হলে শুনতে হত ‘চুপ করো'। বড়োদের আমোদ-আহ্লাদ সবসময় খুব যে চুপচাপে সারা হত তা নয়। তাই দূর থেকে কখনো কখনো ঝরনার ফেনার মতো তার কিছু কিছু পড়ত ছিটকিয়ে আমাদের দিকে। এ বাড়ির বারান্দায় ঝুঁকে পড়ে তাকিয়ে থাকতুম, দেখতুম ও বাড়ির নাচঘর আলোয় আলোময়।‘

তবে সেসময়ে কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুরবাড়ির শাসনে কড়াকড়ি থাকলেও বাড়াবাড়ি ছিলো না। হয়তো এজন্য এক রাতে রবিদের বয়সি সকলে ডেকে নাটক দেখানো হয়েছিলো। লেখকের কলমেই জানা যায় সেই রাতের বর্ণনা। ‘একবার কী কারণে তাঁদের মন নরম হয়েছিল , হুকুম বেরল, ছেলেরাও যাত্রা শুনতে যাবে। ছিল নলদময়ন্তীর পালা। আরম্ভ হবার আগে রাত এগারোটা পর্যন্ত বিছানায় ছিলুম ঘুমিয়ে। বারবার ভরসা দেওয়া হল, সময় হলেই আমাদের জাগিয়ে দেওয়া হবে।’ সেই রাতে তাকে ঘুম থেকে জাগানো হয়েছিলো যাত্রা দেখানোর জন্য। যাত্রার আসর দেখে তার চোখে ধাঁধা লাগার জোগাড়। তিনি নিজের লেখায় এর বর্ণনায় বলেছেন, ‘একতলায় দোতলায় রঙিন ঝাড়লণ্ঠন থেকে ঝিলিমিলি আলো ঠিকরে পড়ছে চার দিকে, সাদা বিছানো চাদরে উঠোনটা চোখে ঠেকছে মস্ত। এক দিকে বসে আছেন বাড়ির কর্তারা আর যাঁদের ডেকে আনা হয়েছে। বাকি জায়গাটা যার খুশি যেখান থেকে এসে ভরাট করেছে। থিয়েটরে এসেছিলেন পেটে-সোনার-চেন-ঝোলানো নামজাদার দল, আর এই যাত্রার আসরে বড়োয় ছোটোয় ঘেঁষাঘেঁষি। তাদের বেশির ভাগ মানুষই, ভদ্দরলোকেরা যাদের বলে বাজে লোক। তেমনি আবার পালাগানটা লেখানো হয়েছে এমন-সব লিখিয়ে দিয়ে যারা হাত পাকিয়েছে খাগড়া কলমে, যারা ইংরেজি কপিবুকের মক্শো করে নি। এর সুর, এর নাচ, এর সব গল্প বাংলাদেশের হাট ঘাট মাঠের পয়দা-করা; এর ভাষা পণ্ডিতমশায় দেন নি পালিশ করে।’ তবে এত আগ্রহ ছিলো যে যাত্রাপালা নিয়ে, তা শেষ পর্যন্ত আর দেখা হয়নি সেদিন ঘুমের অত্যাচারে।

ডাকাত এলো খেলা দেখাতে
সে মাঝেমাঝেই ডাকাতি হতো। সেই ডাকাতি করার খেলাটাও ছিলো কলকাতার বাবুদের এক ধরনের বিনোদন। অবাক হচ্ছো? ডাকাতি করা আবার বিনোদন হয় কিভাবে? আসলে একদল লোক ডাকাতির খেলা দেখাতো। রবীন্দ্রনাথও একদিন এই খেলা দেখেছিলেন নিজের বাড়ির উঠানে বসে। ‘মস্ত মস্ত কালো কালো জোয়ান সব, লম্বা লম্বা চুল। ঢেঁকিতে চাদর বেঁধে সেটা দাঁতে কামড়ে ধরে দিলে ঢেঁকিটা টপকিয়ে পিঠের দিকে। ঝাঁকড়া চুলে মানুষ দুলিয়ে লাগল ঘোরাতে। লম্বা লাঠির উপর ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠল দোতলায়। একজনের দুই হাতের ফাঁক দিয়ে পাখির মতো সুট করে বেরিয়ে গেল। দশ-বিশ ক্রোশ দূরে ডাকাতি সেরে সেই রাত্রেই ভালোমানুষের মতো ঘরে ফিরে এসে শুয়ে থাকা কেমন করে হতে পারে, তাও দেখালে। খুব বড়ো একজোড়া লাঠির মাঝখানে আড়-করা একটা করে পা রাখবার কাঠের টুকরো বাঁধা। এই লাঠিকে বলে রন’পা। দুই হাতে দুই লাঠির আগা ধরে সেই পাদানের উপর পা রেখে চললে এক পা ফেলা দশ পা ফেলার সামিল হত, ঘোড়ার চেয়ে দৌড় হত বেশি।’

পড়াশোনার জাঁতাকলের ফাঁকে গানের সঙ্গে মিতালী
তোমাদের মতো রবীন্দ্রনাথও পড়াশোনার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছেন। সেই জাঁতা ঘোরার শব্দ নাকি চিলো ঘর্ঘরঘর্ঘর। সেই পড়ালেখার জাঁতাটার খড়িটা ছিলো রবির সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথের হাতে। তিনি ছিলেন কড়া শাসনকর্তা। তবে সেই জবরদস্তি মাল বোঝাইয়ের মতো লেখাপড়া বোঝাই করেন নি রবি। তার ভাষায়- ‘আমার বিদ্যেটা লোকসানি মাল।’ তখন তিনি গানের স্কুলেও ভর্তি হয়েছিলেন। তাকে গানে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন বিঞ্চু ওস্তাদ। তিনি রবীন্দ্রনাথকে গান শেখানো শুরু করেছিলেন ছন্দের দিশি তাল বাঁয়া-তবলার বোলের তোয়াক্কা না করে। সেই সঙ্গীত নাকি আপনা-আপনি নাড়িতে নাচতে থাকতো। যেমনটি শিশুদের মন-ভোলানো প্রথম সাহিত্য শেখানো মায়ের মুখের ছড়া দিয়ে, শিশুদের মন-ভোলানো গান শেখানোর শুরু সেই ছড়ায় এইটে আমাদের উপর দিয়ে পরখ করানো হয়েছিল। সে সময় অবশ্য হারমনিয়ামও ছিলো না এ দেশে। কাঁধের উপর ত¤^ুরা তুলে গান অভ্যেস করেছিলেন তিনি।

দিনের শুরুতে পালোয়ান আর রাতে ঘুমকাতুরে
রবীন্দ্রনাথ তখন কিছুটা বড় হয়ে উঠছেন। শৈশবের আলো গিয়ে ঠেকেছে কৈশোরের সীমায়। রোজ ভোরে যখন আলোর ফুটনি অন্ধকার তাড়িয়ে নিত, তখন ভাঙ্গতো ঘুম। বিছানা থেকে উঠেই দে ছুট গোলাবাড়ির দিকে। সেখানে শহরে এক ডাকসাইটে পালোয়ান ছিল, কানা পালোয়ান, তার কাছে কুস্তি লড়তে যেতেন তিনি। সেই ঘরের বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি বলেছেন, ‘এক হাত আন্দাজ খুঁড়ে মাটি আলগা করে তাতে এক মোন সরষের তেল ঢেলে জমি তৈরি হয়েছিল। সেখানে পালোয়ানের সঙ্গে আমার প্যাঁচ কষা ছিল ছেলেখেলা মাত্র। খুব খানিকটা মাটি মাখামাখি করে শেষকালে গায়ে একটা জামা চড়িয়ে চলে আসতুম।’ এটা অবশ্য অপছন্দ ছিলো তার মায়ের। মায়ের ভয় ছিলো ছেলের গায়ের সাহেবী রঙ না আবার মেটে হয়ে যায় পাছে। এরপর কুস্তির আখড়া থেকে ফিরে বসতে হতো এক ডাক্তারি পড়–য়া ছাত্রের সামনে। তুমিও যেমন রোজ বসো তোমার প্রাইভেট টিউটরের সামনে। তবে রবির সেই স্যার প্রথম যেদিন পড়াতে আসেন, সেদিন সঙ্গে করে এনেছিলেন আস্ত একটা কঙ্কাল। প্রতি রাতে শোবার ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা কঙ্কালটার হাঁড়গুলো যখন হাওয়ায় নড়তো খট খট করে, তখন আর ভয় করতো না রবির। কেননা, হাড়গুলোর শক্ত শক্ত নাম সব জানা হয়েছিল আগেই।

যাই হোক রোজকার রুটিন মতো দেউড়িতে ৭টা বাজলে নীলকমল মাস্টার আসতেন পড়াতে। রবি বই, শ্লেট নিয়ে সেই মাস্টারের সামনে গিয়ে বসতেন টেবিলে। তিনি বাংলায় শেখাতেন সব পড়া। পাটিগণিত, বীজগণিত, রেখাগণিত, এমন কী সাহিত্যের ‘সীতার বনবাস' থেকে ‘মেঘনাদবধ' কাব্য’ পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল প্রাকৃত-বিজ্ঞান। আবার মাঝে মাঝে আসতেন বিজ্ঞানের স্যার সীতানাথ দত্ত। তবে বিজ্ঞানের প্রতি অতোটা মনোযোগ ছিলো না রবির। তিনি তা অকপটে বলেও গেছেন। ‘সারা সকাল জুড়ে নানারকম পড়ার যতই চাপ পড়ে মন ততই ভিতরে ভিতরে চুরি করে কিছু কিছু বোঝা সরাতে থাকে, জালের মধ্যে ফাঁক করে তার ভিতর দিয়ে মুখস্থ বিদ্যে ফসকিয়ে যেতে চায়।‘ বাড়ন্ত বেলায় সূর্য উপরে উঠে গিয়ে বেলা নটা পর্যন্ত পৌঁছালে বেঁটে, কালো গোবিন্দ কাঁধে হলদে রঙের ময়লা গামছা ঝুলিয়ে রবিকে নিয়ে যেতেন স্নান করাতে। আর সাড়ে নটায় দেওয়া হতো রোজকার বরাদ্দ- ডাল, ভাত, মাছের ঝোলের বাঁধা ভোজ। তিনি দশটার সময় যেতেন স্কুলে। বুড়ো ঘোড়া পালকিগাড়িতে করে টেনে চলতো তাকে আন্দামানেÑ যেখানে ছিলো তার স্কুল। তিনি শৈশবে কয়েকটি স্কুলে পড়েছেন। কলকাতা ওরিয়েন্টাল সেমিনার, নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমী এবং সেন্ট জেভিয়ার্সে। তবে কোনটাতেই মন বসিয়ে থিতু হতে পারেননি। সে যাইহোক, এরপর সাড়ে চারটায় বাড়ি ফিরলেই জিমন্যাষ্টিকসের মাস্টারের সামনে পড়তে হতো। কাঠের ডাণ্ডার উপর ঘণ্টাখানেক ধরে শরীরটাকে ওলটপালট করে গিয়ে বসতেন ছবি-আঁকার মাস্টারের কাছে। ক্রমে দিনের মরচে পড়া আলো কালো হতে থাকে। তখন পড়বার ঘরে জ্বলে ওঠতো তেলের বাতি। অঘোর মাস্টার আসতেন সেই সময়ে। শুরু হতো ইংরেজি পড়া। কালো মলাটের বইটার মলাটটা ছিলো ঢল্ঢলে, পাতাগুলো কিছু ছিঁড়েছে, কিছু দাগি। তিনি পড়তে পড়তে ঢুলতেন, ঢুলতে ঢুলতে চমকে উঠতেন স্যারের সামনে বসেই। এরপর যখন বিছানায় ঘুমোতে যেতেন, ততক্ষণে তার কানে বাজতে শুরু করতো ‘রাজপুত্তুর চলেছে তেপান্তর মাঠে'।

ছুটির দিনে ছাদের দেশে
কৈশোরের রবীন্দ্রনাথ একা থাকতেই ভালোবাসতেন। এই একাকী সময়গুলো কাটতো তাদের বাড়ির চিলেকোঠায়। সবাই যখন নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত তখন তিনি চুপিচুপি ছাদে যেতেন। রবির ভাষ্য, ‘তখন ঐ ছাদে যাওয়া ছিল আমার সাত-সমুদ্দুর-পারে যাওয়ার আনন্দ। চিরদিনের নীচতলার বারান্দায় বসে বসে রেলিঙের ফাঁক দিয়ে দেখে এসেছি রাস্তার লোক-চলাচল; কিন্তু ঐ ছাদের উপর যাওয়া লোকবসতির পিল্পেগাড়ি পেরিয়ে যাওয়া। ওখানে গেলে কলকাতার মাথার উপর দিয়ে পা ফেলে ফেলে মন চলে যায় যেখানে আকাশের শেষ নীল মিশে গেছে পৃথিবীর শেষ সবুজে। নানা বাড়ির নানা গড়নের উঁচুনিচু ছাদ চোখে ঠেকে, মধ্যে মধ্যে দেখা যায় গাছের ঝাঁকড়া মাথা। আমি লুকিয়ে ছাদে উঠতুম প্রায়ই দুপুর বেলায়। বরাবর এই দুপুর বেলাটা নিয়েছে আমার মন ভুলিয়ে। ও যেন দিনের বেলাকার রাত্তির, বালক সন্ন্যাসীর বিবাগি হয়ে যাবার সময়। খড়খড়ির ভিতর দিয়ে হাত গলিয়ে ঘরের ছিট্কিনি দিতুম খুলে। দরজার ঠিক সামনেই ছিল একটা সোফা; সেইখানে অত্যন্ত একলা হয়ে বসতুম।’ এমনটা কী তোমার জীবনেও ঘটে? মিলে গেছে কি রবির ছেলেবেলা আর তোমার সময়!
সে ছিলো নতুন ঘরে নতুন দিনের গান
তখন বুঝি একটু একটু বড়ো হচ্ছিলেন রবি। যেমনটি তোমাদের বেলাতেও হয়। বয়স বাড়লে মা-বাবাই ঘর আলাদা করে দেন। এ যেন তোমার বড়ো হবার স্বীকৃতি। ছেলেবেলা’য় রবি লিখেছেন, ‘ছাদের রাজ্যে নতুন হাওয়া বইল , নামল নতুন ঋতু । তখন পিতৃদেব জোড়াসাঁকোর বাস ছেড়েছিলেন। জ্যোতিদাদা এসে বসলেন বাইরের তেতলার ঘরে। আমি একটু জায়গা নিলুম তারই একটি কোণে।’ তবুও বড়োতে আর ছোটতে বয়সের ফাঁক তা সহজে যায় না মিলে। এক্ষেত্রে রবি বেশ ভাগ্যবান। ভাই জোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কল্যাণে বড়ো-ছোট’র ব্যবধান তার জীবন থেকে গিয়েছিলো মিলিয়ে।

রবীন্দ্রনাথ রিখেছেন- ‘আগেই বলেছি সেকালে বড়ো ছোটোর মধ্যে চলাচলের সাঁকোটা ছিল না। কিন্তু এই-সকল পুরোনো কায়দার ভিড়ের মধ্যে  জ্যোতিদাদা এসেছিলেন নির্জলা নতুন মন নিয়ে। আমি ছিলুম তাঁর চেয়ে বারো বছরের ছোটো। বয়সের এত দূর থেকে আমি যে তাঁর চোখে পড়তুম এই আশ্চর্য। আরও আশ্চর্য এই যে, তাঁর সঙ্গে আলাপে জ্যাঠামি বলে কখনও আমার মুখ চাপা দেন নি। তাই কোনো কথা ভাবতে আমার সাহসে অকুলোন হয় নি । আজ ছেলেদের মধ্যেই আমার বাস। পাঁচরকম কথা পাড়ি, দেখি তাদের মুখ বোজা। জিজ্ঞেসা করতে এদের বাধে। বুঝতে পারি, এরা সব সেই বুড়োদের কালের ছেলে যে কালে বড়োরা কইত কথা আর ছোটোরা থাকত বোবা। জিজ্ঞাসা করবার সাহস নতুন কালের ছেলেদের; আর বুড়োকালের ছেলেরা সব-কিছু মেনে নেয় ঘাড় গুঁজে।’ এখন বলতো তুমি যাবে কোন দলে?

চৌদ্দ গুনতে ছন্দে শেখা যায় লেখার মন্ত্র
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম কবিতাটি লেখেন যখন তার বয়স ছিলো মাত্র সাত। আর সেই বয়সে কেমন করেই তিনি লিখেছিলেন? এর উত্তরও তিনি দিয়েছেন তোমারই জানা জন্য। ‘সেদিন ছোটো বয়সের ছেলে-কবি কবিতা লিখেছে মনে পড়ে না, এক আমি ছাড়া। আমার চেয়ে বড়ো বয়সের এক ভাগনে একদিন বাৎলিয়ে দিলেন চোদ্দো অক্ষরের ছাঁচে কথা ঢাললে সেটা জমে ওঠে পদ্যে। স্বয়ং দেখলুম এই জাদুবিদ্যের ব্যাপার। আর হাতে হাতে সেই চোদ্দো অক্ষরের ছাঁদে পদ্মও ফুটল; এমন-কি তার উপরে ভ্রমরও বসবার জায়গা পেল। কবিদের সঙ্গে আমার তফাত গেল ঘুচে, সেই অবধি এই তফাত ঘুচিয়েই চলেছি।’

সেই যে শুরু, এরপর তিনি রচনা করেছেন অজস্র। বাংলা সাহিত্য ভান্ডার তাঁর দানে হয়েছে পরিপুষ্ট। রবীন্দ্রনাথ একাধারে ছিলেন কবি, নাট্যকার, সঙ্গীত স্রষ্ঠা, উপন্যাসিক, প্রবন্ধকার। আসলে সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তার হাতের শৈল্পিক ছোঁয়া পড়েনি। তোমরা শুনলে অবাক হবে, তিনি ৫২ টি কবিতার বই, ৩৮ টি নাটক, ১৩ টি উপন্যাস ও ৩৬ টি প্রবন্ধ বই এবং অন্যান্য গদ্য সংকলন লিখে গেছেন। তার লেখা ছোট গল্পের মোট সংখ্যা ৯৫টি এবং তিনি ১৯১৫ টি গান লিখেছেন; যা যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতানে সংকলিত করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত বই এবং অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খন্ডে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খন্ডে ‘চিঠিপত্র’ ও চারটি পৃথক বইয়ে প্রকাশ করা হয়। এছাড়া তিনি প্রায় ২ হাজার ছবিও এঁকেছিলেন। তাঁর রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে কবিকে তার লেখা ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘নোবেল’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। সেই কবিই গোসাই নামের এক প্রকাশকের অনুরোধে ছেলেদের জন্য একটি লেখা লিখতে গিয়ে লেখেন ছেলেমানুষ রবীন্দ্রনাথের কথা। এবং লিখেও ফেললেন তার ছোটবেলা নিয়ে ‘ছেলেবেলা’।

এই লেখাটি পড়ে যদি ভালো লাগে তবে সেই ভালোলাগাটি হলো দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। আর খাঁটি দুধের স্বাদ যদি চাও সময় করে পড়ে নিও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা সেই ‘ছেলেবেলা’ বইটি।



বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/রাশা/সাগর/এইচআর/মে ৫/২০১১