রোবট নিয়ে তো তোমাদের ব্যাপক আগ্রহ, তাই না? রোবট নিয়ে যতো সাইন্স-ফিকশন আর
গল্প হাতের কাছে পাও সবই ঝটপট করে পড়ে ফেলো। রোবট নিয়ে কোনো ছবি হলে তো
কথাই নেই, সেটা শেষ না করে ওঠাই যাবে না। কিন্তু এই যে রোবট, এর ইতিহাস কি
জানো? কে প্রথম রোবট তৈরির কথা বলেছিলেন, ‘রোবট’ শব্দটাই বা আসলো কোত্থেকে,
অথবা কিভাবেই বা রোবট তৈরির প্রযুক্তি আজকের পর্যায়ে আসলো, এসব কথা কি
তোমাদের জানতে ইচ্ছে করে না? করবে না-ই বা কেন, সেসব তো আমারও খুব জানতে
ইচ্ছে করে! চলো, মানুষের ইতিহাসের পরে এবারে জেনে আসি রোবটদের ইতিহাস!রোবটদের ইতিহাসের শুরু কিন্তু অনেক অ-নে-ক দিন আগে। তখনো যীশুখ্রিস্টের জন্ম হয়নি, আমরা যে ইংরেজি সন মেনে চলি, তখনো সেই সন গণনাও শুরু হয়নি। আর রোবটদের ইতিহাসের শুরু যীশুর জন্মেরও ৩২০ বছর আগে। অ্যারিস্টটলের কথা শুনেছো না তোমরা? পৃথিবীর সেরা দার্শনিকদের একজন ছিলেন এই অ্যারিস্টটল। তিনি সেই আদ্যিকালেই বললেন যে, যদি সব যন্ত্র আদেশ দিলেই কাজ করতো, কিংবা নিজে নিজেই তা করতে পারতো যা ঐ যন্ত্রের করার কথা! তাহলে আর কাউকে শিক্ষানবীশ হতে হতো না, কাউকে দাসও থাকতে হতো না। যে যন্ত্র নিজে নিজেই কাজ করতে পারে, তাকেই তো রোবট বলে, তাই নয় কি! চিন্তা করো, সেই কবে তিনি রোবটের কথা চিন্তা করেছিলেন! আজ থেকে দুই হাজার বছরেরও বেশি আগের কথা সেটা!
এরপর প্রায় দেড় হাজার বছর রোবট নিয়ে আর কোনো কাজই হয় নি। হবে কিভাবে,
চিন্তা করলেই তো আর রোবট তৈরি হয় না। সেজন্য যেমন প্রতিভাবান মানুষ লাগবে,
তেমনি লাগবে উপযুক্ত প্রযুক্তি। তবে ১৪৯৫ সালে কিন্তু একজন উপয্ক্তু
প্রযুক্তি ছাড়াই প্রথম রোবট বানানোর পরিকল্পনা করলেন। কে করলেন? তিনি একজন
মহা প্রতিভাধর মানুষ। কী করেননি তিনি তাঁর এক জীবনে! একই সঙ্গে তিনি
পৃথিবীর একজন নামকরা চিত্রশিল্পী, বিজ্ঞানী, চিকিৎসাবিদ, আরো কতো কী! তিনি
কিন্তু প্রথম একটা উড়োজাহাজেরও পরিকল্পনা করেছিলেন। কি, এখন মনে হয় অনেকেই
চিনতে পেরেছো? হ্যাঁ, তার নাম লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। তিনিই প্রথম রোবট
তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তাই কি আর ওই আমলে রোবট বানানো যায়!এরপর ১৭০০-১৯০০ সালের মধ্যে মানুষ অনেক ছোটোখাটো রোবট বানানোর চেষ্টা করেছে। আর অনেকে তো বানাতেও সমর্থ হয়েছিলো। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলো একটা যান্ত্রিক হাঁস। হাঁসটা বানিয়েছিলেন জ্যাঁক দ্য ভকেনসন। এই হাঁসটা গলা বাড়াতে পারতো, পাখা নাড়াতো পারতো, এমনকি খাবার গিলতেও পারতো! কেমন মজার ছিলো না হাঁসটা! কিন্তু খাবার গেলার পর খাবারের কি হতো? তা তো জানি না!
১৯১৩ সাল। পৃথিবীতে প্রথম কোনো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রকে কাজে লাগানো হলো। কাজে লাগালেন হেনরি ফোর্ড, তার গাড়ির কারখানায়। কনভ্যেয়ার বেল্ট চেনো তোমরা? কার্টুনে কি ছবিতে দেখো না, কারখানায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বহন করে নিয়ে যাচ্ছে একটা মোটা বেল্টের মতো চলমান কী একটা, ওটাই কনভ্যেয়ার বেল্ট। তিনিই প্রথম এই স্বয়ংক্রিয় কনভ্যেয়ার বেল্ট ব্যবহার করেন। অনেকেই হয়তো ভাবছো, এটা আবার রোবট হয় কিভাবে? রোবটের হাত থাকতে হবে, পা থাকতে হবে, স্টিলের শরীর থাকতে হবে, তা নইলে আর কিসের বোরট? উঁহু, আগেই তো বলেছি, যেই যন্ত্র নিজে নিজে কাজ করতে পারে, সেটাই রোবট। সেই হিসেবে কনভ্যেয়ার বেল্টটা কি রোবটের মধ্যে পড়ে না?
অবশ্য, তখনো পর্যন্ত মানুষ এগুলোকে রোবট বলতো না। বলা শুর“ করলো ১৯২০ সাল
থেকে। আর নামটির প্রচলন করেন ক্যারেল কাপেক। তিনি একটি মঞ্চনাটক তৈরি করেন,
নাম ‘রসিউম’স ইউনিভার্সাল রোবটস’। সে এমন এক সমাজের গল্প, যেখানে মানুষ
অনেক উন্নতমানের রোবট তৈরি করেছিলো। কিন্তু পরে তাদের তৈরি এই রোবটগুলোই
তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। রোবটেরা সব ক্ষমতা দখল করে মানুষদেরই দাস
বানালো! কি, গল্পটা খুব পরিচিত ঠেকছে? এই গল্প নিয়েই তো পরে কতো বিখ্যাত
বিখ্যাত সব বই যে লেখা হয়েছে, আর কতো যে ছবি বানানো হয়েছে। যেমন ধরো,
টার্মিনেটর, দ্য ম্যাটিক্স, কিংবা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। এমনি কতো যে নাম বলা
যায়!এর ১২ বছর পর, ১৯৩২ সালে জাপান তৈরি করলো এক সত্যিকারের রোবট। অবশ্য আকৃতিতে এতোই ছোটো ছিল যে, একে খেলনা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না; মাত্র ১৫ সে.মি.। আর তাই এর নামও দেয়া হলো ‘লিলিপুট’। এটা কি করতে পারতো? হু হু, এটা বেশ জাঁক করে হাঁটতে পারতো।
যারা খুব সাইন্স ফিকশন পড়ো, তারা তো আইজ্যাক আজিমভকে খুব চেনো। বিশ্বের অন্যতম সেরা সাইন্স ফিকশন লেখক এই রুশ ভদ্রলোক। সাইন্স ফিকশনের এই রাজা ১৯৪১ সালে লিখলেন একটি গল্প, নাম ‘লায়ার!’ মানে মিথ্যেবাদী। ভাবছো, এটা রোবটদের নিয়ে লেখা বলেই বুঝি বিখ্যাত। উঁহু, শুধু তাই নয়, এই গল্পে তিনি রোবটদের জন্য ৩টি মূলনীতিও দিয়েছিলেন। সেই মূলনীতিগুলোর জন্যই গল্পটা বেশি বিখ্যাত। মূলনীতি ৩টা শুনবে?
১. একটি রোবট কখনোই কোনো মানুষকে আহত করবে না, এমনকি মানুষের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো কাজও করবে না।
২. একটি রোবট সবসময়ই মানুষের দেয়া যে কোনো আদেশ মানবে, শুধুমাত্র যদি সেটা প্রথম মূলনীতির সাথে সংঘাতপূর্ণ না হয়। মানে, যদি কোনো মানুষ এমন কোনো আদেশ দেয়, যেটা অন্য কোনো মানুষের জন্য বা সমগ্র মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর, তাহলে রোবট অবশ্যই সেই আদেশ মানবে না।
৩. একটি রোবট অবশ্যই নিজেকে রক্ষা করবে, যতোক্ষণ না পর্যন্ত সেটা প্রথম দু’টা মূলনীতির সাথে সংঘাতপূর্ণ না হয়। মানে, মানুষের ক্ষতি না করে এবং মানুষের আদেশ অনুসরণ করে সে তাঁর নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করে চলবে।
কেমন মজার না মূলনীতিগুলো? কিন্তু রোবটেরা যদি আসলেই সেরকম উন্নত হয়ে যায়,
তখন মানুষ আর রোবট আলাদা করার উপায় কি হবে? সেই ব্যবস্থা করলেন অ্যালান
ট্যুরিং। ১৯৫০ সালে তিনি এমন এক পরীক্ষার প্রস্তাব করলেন, যেটার মাধ্যমে
খুব সহজেই তুমি বুঝতে পারবে, তুমি যার সঙ্গে কথা বলছো, সে রোবট না মানুষ।
এর নাম দেয়া হয় ‘ট্যুরিং টেস্ট’।
এরপরেই, ১৯৫৪ সালে জর্জ ডেভল আর জো অ্যাঙ্গেলবার্গ তৈরি করলেন পৃথিবীর
প্রথম প্রোগ্রামেবল রোবট। এর নাম দিলেন তাঁরা ‘আর্ম’। আর এই ‘আর্ম’-ই প্রথম
জেনারেল মটর্সের কারখানার ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে মানুষকে সরিয়ে সেই জায়গায়
কাজ করতে শুর“ করলো।
এরপরের কিছুদিনে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের বা রোবটের জগতে খুব দ্রুত কিছু বড়োসড়ো
কাজ হয়ে গেলো। ১৯৫৭ সালে রাশিয়া মহাকাশে পাঠালো প্রথম স্যাটেলাইট
‘স্পুতনিক’। ১৯৬৪ সালে আইবিএম তৈরি করলো প্রথম বলার মতো কম্পিউটার আইবিএম
৩৬০। ১৯৬৯ সালে রোবটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তো নীল আর্মস্ট্রং, এডউইন
অলড্রিনরা চাঁদ থেকেই ঘুরে আসলেন। ভাবছো, এগুলো আবার রোবটের ইতিহাসে আসলো
কিভাবে? ভুলে যাচ্ছো, যেটা একা একা কাজ করতে পারে, সেটাই রোবট। এবার বলো
তো, স্যাটেলাইট কি একা একা কাজ করে না? কম্পিউটারও তো তাই। তুমি শুধু বসে
বসে কীবোর্ড টিপে টিপে আর মাউস চেপে চেপে নির্দেশ দাও, আর ও একা একাই গেমস
রান করে, গান চালায়, ছবি দেখায়। তাহলে এগুলো রোবট নয়তো কী?
১৯৯৪ সালে কার্নেগি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করলো ৮ পায়ের এক রোবট। নাম দান্তে
টু। শুধু তাই না, ওকে দিয়ে সংগ্রহ করা হলো আগ্নেয়গিরির ভেতরের গ্যাসের
নমুনাও!
একই বছর জাপানে শুরু হলো রোবোকাপ টুর্নামেন্ট। এই টুর্নামেন্টের লক্ষ্য কি জানো? ২০৫০ সালে রোবটদের এমন এক ফুটবল দল বানানো, যেটা পৃথিবীর সেরা ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দলকেও হারিয়ে দেবে!
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/এনজে/সাগর/এইচআর/জুলাই ৫/১১








