আচ্ছা, জলপ্রপাত জিনিসটা কি? বোকার মত প্রশ্ন হয়ে গেলো, তাই না? জলপ্রপাত আবার কে না চেনে! তোমরাও নিশ্চয়ই চেনো। জলপ্রপাত হচ্ছে উঁচু থেকে পড়া পানির স্রোত। পাহাড় থেকে বা অনেক উঁচু থেকে পানির এই স্রোত যখন হুড়মুড় করে নিচে এসে পড়ে, তখন তাকে বলে জলপ্রপাত। মানে অনেক উঁচু ঝরনা আরকি! নিশ্চয়ই মনে প্রশ্ন জাগছে, এই পানিটা আসে কোত্থেকে? দাঁড়াও, বলছি। পৃথিবীর বেশিরভাগ বড় বড় জলপ্রপাতের জন্ম হয়েছে কোনো না কোনো নদী থেকে। এই যেমন ধরো, নায়াগ্রা জলপ্রপাতের উৎপত্তি হয়েছে নায়াগ্রা নদী থেকে। আবার জাম্বেসি নদী থেকে সৃষ্টি হয়েছে ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের। তবে নদী ছাড়াও বরফগলা পানির স্রোত, হ্রদ অথবা মাটির নিচ থেকে উঠে আসা পানি থেকেও তৈরি হতে পারে জলপ্রপাত। আমাদের দেশে যে দু’টো জলপ্রপাত আছে, সে তো বলেছি-ই। তবে সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের দেশের এই জলপ্রপাত দুটি একেবারেই বাচ্চা আকৃতির জলপ্রপাত। সারা পৃথিবীজুড়ে এর চেয়েও আরো কতো বিশাল বিশাল আর জলপ্রপাত যে আছে! সে সব জলপ্রপাতের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। দানবের মত গর্জন করে এসব জলপ্রপাতের পানি আছড়ে পড়ছে অ-নে-ক নিচে। আর ঝাঁপিয়ে পড়া পানির কণাগুলো বাষ্পে পরিণত হয়ে নয়তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে সৃষ্টি করছে ধোঁয়া। অসাধারণ সে সব দৃশ্য। কী, আর লোভ সামলাতে পারছো না? তাহলে আর দেরি করে লাভ কি? চলো এবার ঘুরে আসি পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত এমনি কয়েকটি জলপ্রপাত থেকে।
এঞ্জেল জলপ্রপাত
প্রথমেই তোমাদের নিয়ে যাবো পৃথিবীবিখ্যাত ‘এঞ্জেল ফলস’-এ। আর এটি দেখতে হলে
যেতে হবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায়। ভেনিজুয়েলার দক্ষিণে অবস্থিত
‘কানাইমা ন্যাশনাল পার্ক’, একে আবার ইউনিসেফ রীতিমতো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট
বলে ঘোষণা দিয়েছে। সেই পার্ক যেই রেইনফরেস্টে, সেখানে এই জলপ্রপাতটি
অবস্থিত। ভাবছো, রেইনফরেস্টটা আবার কি? রেইনফরেস্ট হচ্ছে চিরসবুজ বৃক্ষের
বন। অর্থাৎ এখানকার গাছগুলো সারা বছরই সবুজ থাকে। আর পুরো বছরজুড়েই এই
অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়। রেইনফরেস্ট নিয়ে এর আগে একটা বিশেষ রচনা তোমাদের জন্য
দেওয়া হয়েছিল। রেইন ফরেস্ট সম্পর্কে জানতে হলে ওটা একবার পড়ে নিয়ো, কেমন?
বিশেষ রচনাটি খুঁজে পাবে কি করে? আচ্ছা, তোমাদেরকে সেই বিশেষ রচনাটির
লিঙ্কও দিয়ে দিচ্ছি, দাঁড়াও-
রেইনফরেস্টের বিশেষ রচনা ।
যাই হোক, এঞ্জেল ফলসের আরও কয়েকটি নাম আছে। এই যেমন, স্প্যানিশ ভাষায় এর
নাম হচ্ছে ‘সালতো এঞ্জেল’। স্থানীয় লোকেদের ব্যবহৃত ‘পেমন’ ভাষায় এই
জলপ্রপাতের নাম হচ্ছে ‘কেরেপাকুপাই ভেনা’, মানে ‘গভীরতম স্থানের জলপ্রপাত’।
এই ভাষাতেই আবার এঞ্জেল ফলসকে ডাকা হয় ‘পারাকুপা ভেনা’ নামে, যার অর্থ
‘সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত’। নিশ্চয়ই ভাবছো, সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত আবার কেন
ডাকা হয়? এই নামে ডাকা হয় কেননা এঞ্জেল ফলস সত্যি সত্যিই পৃথিবীর সবচেয়ে
উঁচু জলপ্রপাত। পৃথিবীর উচ্চতম এই জলপ্রপাতে প্রায় ৯৭৯ মিটার বা ৩,২১২ ফুট
উঁচু থেকে পানি নিচে পড়ছে। এই এঞ্জেল ফলস উচ্চতায় প্রায় ৩২১ তলা বা প্রায় ১
কিলোমিটার উঁচু! আর যেই উঁচু পাহাড় থেকে এই এঞ্জেল ফলসের পানি গড়িয়ে পড়ছে
তার নাম ‘আওয়ানতেপুই’। এই নামের অর্থ কী জানো? ‘শয়তানের পাহাড়’! কী, ভয়
পেয়ে গেলে নাকি? ভয় পাবার মত নামই বটে। সত্যি সত্যিই সেখানে শয়তান থাকে
কিনা কে জানে! আসলে পাহাড়টা এতোই দুর্গম জায়গায় যে সেখানে যাওয়া যেমন
কষ্টকর, ফিরে আসাটা আরো কষ্টকর। এজন্যই বোধহয় সেখানকার অধিবাসীরা পাহাড়টিকে
এই নামে ডাকে।
যাই হোক, এবার শোনো একটা মজার জিনিস। যদিও একটু আগেই বলেছি যে, যে কোনো
জলপ্রপাতের উৎস হচ্ছে কোনো নদী, হ্রদ, বরফগলা পানির স্রোত অথবা মাটির নিচ
থেকে উঠে আসা পানি। তবে এঞ্জেল ফলসের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম। সত্যি
কথা বলতে কি, এঞ্জেল ফলসের পানির সেরকম কোনো উৎসই নেই! রেইনফরেস্ট অঞ্চলে
সারাবছর যে বৃষ্টিপাত হয়, সেই বৃষ্টির পানিই পাহাড় থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে
সৃষ্টি করেছে এই জলপ্রপাতের! ব্যাপারটা সত্যিই বিস্ময়কর, তাইনা? প্রায় এক
কিলোমিটার উঁচু থেকে এই বৃষ্টির পানি গিয়ে পড়ে নিচের ‘কেরিপ’ নদীতে। সেখান
থেকে গিয়ে মেশে ‘চুরুন’ নদীতে। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত আর মজার বিষয়টি কী জানো?
প্রায় এক কিলোমিটার উঁচু থেকে পড়া এঞ্জেল ফলসের বেশিরভাগ পানিই নিচে পড়ার
আগেই বাষ্প হয়ে যায়। আর এই বাষ্পই জলপ্রপাতটির চারিদিকে একটা কুয়াশার
আস্তরণ সৃষ্টি করে। কী, অবাক হয়ে গিয়েছো নিশ্চয়ই?
এতক্ষণে বোধহয় একটা প্রশ্ন তোমাদের মনে এসেই গেছে, এতো গভীর দুর্গম জঙ্গলে
এরকম একটা জলপ্রপাত মানুষ খুঁজে পেল কি করে? সেও এক ভীষণ প্রশ্ন বটে। আর
সত্যি সত্যিই এঞ্জেল ফলসের আবিষ্কারের ঘটনাটাও বেশ মজার। অনেক আগে থেকেই
মানুষ ঐ পাহাড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু কেউ-ই যেতে পারছিলো না। আর
যারাও বা গিয়েছিলো, তারা আর ফিরেও আসেনি। এমনি এমনিই তো আর ঐ পাহাড়ের নাম
শয়তানের পাহাড় হয়নি! অবশেষে ১৯৩৭ সালে জিমি এঞ্জেল নামের আমেরিকার এক পাইলট
একটা ছোট্ট বিমানে করে সেখানে গিয়ে পৌঁছান। তিনি, তাঁর স্ত্রী আর তাঁর দুই
বন্ধু আওয়ানতেপুই পাহাড়ে অবতরণ করলেন। আর সেখানেই তারা আবিষ্কার করলেন
পৃথিবীর উচ্চতম এই জলপ্রপাতটিকে। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে আসার সময়ই ঘটলো
বিপত্তি। কোনোভাবেই জিমি সাহেব তার ছোট্ট প্লেনটি ওড়াতে পারলেন না। শেষে আর
কি করার, পায়ে হেঁটেই তারা রওয়ানা দিলেন! আর টানা ১১ দিন ধরে হেঁটে তবেই
এই ভয়ঙ্কর জঙ্গল পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছালেন লোকালয়ে। এরপর তাঁর কাছে থেকেই
মানুষ জানলো এই জলপ্রপাতের কথা। তাঁর নামেই জলপ্রপাতটির নাম রাখা হলো
‘এঞ্জেল ফলস’।
নায়াগ্রা ফলস
এঞ্জেল ফলস যেমন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত, তেমনি নায়াগ্রা ফলসও পৃথিবীর
সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত। তবে পার্থক্যটা হলো, এঞ্জেল ফলস সর্ববৃহৎ হচ্ছে উচ্চতার
দিক থেকে, আর নায়াগ্রা ফলস সর্ববৃহৎ হচ্ছে পানি পতনের পরিমানের দিক থেকে।
অর্থাৎ উচ্চতায় মাত্র ১৬৫ ফুট হলেও পানি পড়ার দিক থেকে নায়াগ্রা ফলস
পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ। শুনে তাজ্জব হয়ে যাবে যে, এই জলপ্রপাত থেকে প্রতি
মিনিটে প্রায় ৬ মিলিয়ন ঘনফুট পানি নিচে পড়ছে! আর এই পানি এতোটাই জোরে আছড়ে
পড়ছে, তুমি নায়াগ্রা জলপ্রপাতের আশপাশে থাকলে তোমার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা
কাউকে কিছু বললে সে কিচ্ছুই শুনতে পাবে না। পানির এই দানবকে দেখতে হলে তুমি
আমেরিকা অথবা কানাডা- যে কোনো দেশেই যেতে পারো। কেননা নায়াগ্রা ফলস এই
দুটি দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। আমেরিকায় গেলে তোমাকে যেতে হবে
নিউইয়র্কে আর কানাডায় গেলে অন্টারিওতে।
নায়াগ্রা জলপ্রপাতের উৎপত্তি হয়েছে নায়াগ্রা নদী থেকেই। বরফ যুগের শেষের
দিকে বরফ গলে সৃষ্টি হয় এই নায়াগ্রা নদী, আর তা থেকেই এই নায়াগ্রা
জলপ্রপাত। নায়াগ্রা ফলস কিন্তু শুধুই একটি জলপ্রপাত নয়। এই জলপ্রপাতটিই
আবার আমেরিকা আর কানাডার ভৌগোলিক সীমারেখা হিসেবে কাজ করছে। এছাড়াও এর
বিশাল পরিমাণ পানির স্রোতকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে জলবিদ্যুৎ।
নায়াগ্রা ফলস প্রকৃতপক্ষে তিনটি জলপ্রপাতের সমষ্টি; হর্সসু ফলস, আমেরিকান
ফলস এবং ব্রাইডাল ভ্যালি ফলস। এর মধ্যে হর্সসু ফলস পড়েছে কানাডার মধ্যে আর
বাকি দুটো ফলস অর্থাৎ আমেরিকান ফলস আর ব্রাইডাল ভেলি ফলস পড়েছে আমেরিকার
মধ্যে। তবে তিনটি ফলসের মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে হর্সসু ফলস; নায়াগ্রা
জলপ্রপাতের প্রায় ৯০% পানিই এই জলপ্রপাত দিয়ে পড়ে।
ভিক্টোরিয়া ফলস
আমেরিকা থেকে এবার আমরা যাবো আফ্রিকায়। সেখানে আছে বিশ্বখ্যাত ভিক্টোরিয়া
ফলস। নায়াগ্রা ফলস আর ভিক্টোরিয়া ফলসের মধ্যে আবার বেশ কয়েকটা মিলও রয়েছে।
এই যেমন ধরো, নায়াগ্রা ফলসের মত ভিক্টোরিয়া ফলসের উৎপত্তিও হয়েছে নদী থেকে;
ভিক্টোরিয়া ফলসের উৎপত্তি হয়েছে জাম্বেসি নদী থেকে। আবার নায়াগ্রা ফলসের
মত ভিক্টোরিয়া ফলসও দুটি দেশের সীমান্তরেখা হিসেবে কাজ করছে- জাম্বিয়া এবং
জিম্বাবুয়ের। তবে সূক্ষভাবে বিচার করলে ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতটি প্রকৃতপক্ষে
জাম্বিয়াতেই পড়েছে। কিন্তু জিম্বাবুয়ের কী ভাগ্য দেখো, ভিক্টোরিয়া
জলপ্রপাতের আসল সৌন্দর্যটাই দেখা যায় সীমান্তের ওপারে জিম্বাবুয়ে থেকে।
১৮৫৫ সালে ডেভিড লিভিংস্টোন নামের বিখ্যাত স্কটিশ পর্যটক সর্বপ্রথম এই
জলপ্রপাতটি দেখতে পান। আর তক্ষুণি তিনি ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার
সম্মানে এই জলপ্রপাতের নাম দিয়ে দেন ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত। তবে স্থানীয়
‘কলোলো’ আদিবাসীদের ভাষায় এই জলপ্রপাতের নাম ‘মসি-ওয়া-তুনয়া’। এই নামের
অর্থ কী জানো? এই নামের অর্থ হচ্ছে ‘বজ্র সৃষ্টিকারী ধোঁয়া’। বেশ ওজনদার
নাম, তাইনা?
ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত উচ্চতার দিক থেকেও বড় নয়, আবার এর আয়তনও নায়াগ্রা
ফলসের চেয়ে কম। তাহলে ভিক্টোরিয়া ফলস এতো বিখ্যাত হলো কেন বলোতো? কারণ হল,
ভিক্টোরিয়া ফলস পৃথিবীর সবচেয়ে চওড়া জলপ্রপাত। উচ্চতায় এটি মাত্র ১০৮ মিটার
হলেও চওড়ায় এই জলপ্রপাত প্রায় ১,৭০৮ মিটার বা ৫,৬০৪ ফুট দীর্ঘ। আর পৃথিবীর
সবচেয়ে চওড়া এই ভিক্টোরিয়া ফলস থেকে গড়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৮,০০০
ঘনফুট পানি নিচে পড়ছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানো? এই বিশাল পরিমাণ পানি
প্রচণ্ড গতিতে নিচে আছড়ে পড়ে সৃষ্টি করছে প্রচুর পরিমাণ ধোঁয়া আর কুয়াশা,
যা কিনা প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা যায়। ভাবছো, এটা ঐ এঞ্জেল
জলপ্রপাতের মতোই ব্যাপার। উঁহু, ওখানে তো পানি বাষ্প হয়ে কুয়াশার মতো হয়ে
যায়। আর এখানে পানি জোরে আছড়ে পড়ার কারণে পানির কণা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কুয়াশার
মতো হয়ে গেছে!
ইগুয়াজু ফলস
ইগুয়াজু ফলস দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। শুধু তাই না, নায়াগ্রা ফলস আর ভিক্টোরিয়া ফলসের মত ইগুয়াজু ফলসও এই দুটি দেশের সীমারেখা হিসেবেই কাজ করছে। তবে ইগুয়াজু জলপ্রপাতের উৎস ইগুয়াজু নদী আবার বেশিরভাগটাই ব্রাজিলের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। আর এই ইগুয়াজু ফলস ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রথম খুঁজে পান আলভার নুনেজ নামের এক স্প্যানিশ।
ইগুয়াজু জলপ্রপাতের নামটা এসেছে সেখানকার আদি অধিবাসী ‘গুয়ারানি’দের কাছ থেকে। তাদের ভাষায় এই নামের অর্থ হচ্ছে ‘বিগ ওয়াটার’ বা ‘প্রচুর পানি’। এখন তো নিশ্চয়ই তোমরা এটা জানতে চাইবে যে এই বিগ ওয়াটার নাম হওয়ার কারণটা কী? সত্যি কথা বলতে কী, এটা একটা-দু’টো জলপ্রপাত না, একসাথে প্রায় ২৭৫টা ছোট ছোট জলপ্রপাত! আর এই বিশাল সংখ্যক জলপ্রপাতগুলো একত্রে প্রায় ৩ কিলোমিটার চওড়া। বছরের যে সময়টায় বৃষ্টি হয় না তখনও এই জলপ্রপাত থেকে প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ১,০০০ ঘনমিটার পানি গড়িয়ে পড়ে। সুতরাং, বুঝতেই পারছো, কেন এই জলপ্রপাতের নাম ‘ইগুয়াজু’ রাখা হয়েছে।
ইগুয়াজু জলপ্রপাত সৃষ্টি নিয়ে আবার বেশ মজার মজার কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। তার একটা শোনাচ্ছি তোমাদের। একবার নাকি স্বর্গের এক দেবতার নাইপি নামের খুবই সুন্দরী এক মেয়েকে ভীষণ পছন্দ হয়ে গেলো। এখন দেবতাটি তো সেই মেয়েকে বিয়ে করবেই। কিন্তু মেয়েটি আবার আগে থেকেই তারোবা একটা ছেলেকে পছন্দ করতো। আর তাদের এমনই গভীর ভালোবাসা, সে দেবতাকে ছেড়ে তারোবার হাত ধরে একটা নৌকায় চড়ে পালিয়ে গেলো। আর ওরা আবার পালিয়ে যাচ্ছিলো এই ইগুয়াজু নদী দিয়েই। তখন সেই দেবতা দেখেন কি, ইগুয়াজ নদীতে একটা নৌকায় করে নাইপি আর ওই লোকটা পালিয়ে যাচ্ছে। তাই না দেখে সেই দেবতা তো ভীষণ রেগে গেলেন। রাগের চোটে তরবারি বের করে এক কোপে নদীটিকেই দুই ভাগ করে দিলেন। আর এভাবেই সৃষ্টি হলো ইগুয়াজু জলপ্রপাতের। কী, জলপ্রপাতের গল্প শুনতে শুনতে কী চমৎকার একটা গল্পও শোনা হয়ে গেলো, তাই না?
ইয়োসেমাইট ফলস
ইয়োসেমাইট ফলস আমেরিকার উত্তর অংশে অবস্থিত ইয়োসেমাইট ন্যাশনাল পার্ক-এ
অবস্থিত। আদতে এই পার্কের সবচেয়ে বড় আকর্ষণই হচ্ছে এই জলপ্রপাত। আর বসন্তের
শেষের দিকে যখন কিনা পুরো জলপ্রপাত পানিতে টইটম্বুর থাকে, তখন তো কথাই
নেই। মানুষ শুধু এই ইয়োসেমাইটকে দেখতেই এখানে ভীড় জমায়।
ইয়োসেমাইট জলপ্রপাতটা কিন্তু বেশ উঁচু-ও বটে। যদিও এঞ্জেল ফলসের মত পৃথিবীর
সবচেয়ে উঁচু নয়, তবে উচ্চতায় নেহায়েতই কম নয় এই ফলস। সত্যি কথা বলতে কী,
এই ইয়োসেমাইট হচ্ছে পৃথিবীর ষষ্ঠ উচ্চতম জলপ্রপাত। আর এর উচ্চতা প্রায় ৭৩৯
মিটার বা ২,৪২৫ ফুট। পুরো জলপ্রপাতটা আবার তিনটা স্তরে বা ধাপে বিভক্ত।
অবশ্য কেউ নিজে থেকে গিয়ে জলপ্রপাতটাকে ভাগ করে দিয়ে আসেনি। প্রাকৃতিকভাবেই
জলপ্রপাতটা তিনটি স্তরে বিভক্ত। সবচেয়ে নিচের স্তরটা মাটি থেকে শুরু করে
২৩০ ফুট বা ৯৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু। মাঝের স্তরটা প্রথম স্তরের পর থেকে শুরু
করে পরের ২০৬ মিটার বা ৬৭৫ ফুট পর্যন্ত। আর সবচেয়ে উপরের স্তরটার পরিধি
একদম চূড়া থেকে ৪৪০ মিটার বা ১,৪৩০ ফুট পর্যন্ত।
ইয়োসেমাইট উপত্যকায় বাস করা ‘আহওয়াহনিচি’ আদিবাসিরা ইয়োসেমাইট ফলসকে ডাকে
‘চলোক’ নামে। এই জলপ্রপাতকে নিয়ে তাদের মাঝে আবার বেশ মজার মজার গল্পও
প্রচলিত আছে। তারা মনে করে যে, এই ঝরনাটা সৃষ্টি করেছে ডাইনীরা এবং তারাই
এটার দেখাশোনা করছে। এইসব ডাইনীদের নাম হচ্ছে ‘পলোতি’। কিন্তু এই ডাইনীরা
এলো কোত্থেকে? সে নিয়েও আছে গল্প। জলপ্রপাত সৃষ্টির আগে এখানে একটা পুকুর
ছিল। একবার এক মহিলা এই পুকুর থেকে বালতিতে পানি নিতে এলো। কিন্তু পানি
থেকে যখনই মহিলাটি বালতিটা তুললো, দেখে কি, বালতি ভর্তি সাপ! সেই রাতে
পুকুরের পানি তার বাড়িটাকে ডুবিয়ে ফেললো। আর সেই মহিলা এবং তার বাচ্চাকেও
গ্রাস করে নিলো।
তো কেমন শুনলে জলপ্রপাতগুলোর গল্প? শুনেই ওগুলো দেখতে যেতে ইচ্ছে করছে?
বেশ, সময়-সুযোগ পেলে খুব করে ঘুরে এসো। তবে সাবধান, ওই সব জলপ্রপাতে গিয়ে
আবার গোসল করার বুদ্ধি করো না যেন। কেননা, পানি যেখানে পড়ে, সেখানে বেশ বড়ো
রকমের একটা কুয়ার মতো গর্ত হয়ে যায়। আর সেই গর্তে কেউ যদি পড়ে যায়, তাহলে
সেখান থেকে ফিরে আসা বেশ কঠিনই বটে। জলপ্রপাতে গোসল করতে চাইলে আমাদের
দেশের জলপ্রপাতগুলোই ভালো। ওগুলো আবার বাচ্চা আকৃতির কিনা! তবে হ্যাঁ,
এখানেও কিন্তু ঐ গর্তের ব্যাপারে সতর্ক থাকতেই হবে।
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/বাবু/এনজে/সাগর/এইচবি/নভেম্বর ২২/১১








