পাখি, কিন্তু ওড়ে না
জানোই তো, বাদুড় উড়তে পারে। এ কারণে তোমাদের অনেকেই হয়তো বাদুড়কে পাখি ভাবতে পারো। কিন্তু বাদুর আসলে স্তন্যপায়ী প্রাণী। শুধু বাদুড়ই নয়, এক ধরনের সামুদ্রিক মাছ আছে যারা স্বল্প সময়ের জন্য বাতাসে উড়তে পারে। তাই বলে সেটা কি পাখি? মোটেই না। সত্যি বলতে কী, উড়তে পারলেই যেমন পাখি হয় না। তাই বাদুড় বা উড়ুক্কু মাছও কখনো পাখি নয়। আবার তেমনি পাখি হলেই যে উড়তে পারবে এমনও নয় ব্যাপারটা। বেশ কিছু প্রাণী আছে যারা নামে পাখি হলেও উড়তে পারে না। এদের সংখ্যাও কিন্তু একেবারে কম নয়। এরকম কয়েকটি পাখি নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন।
শুরুর কথা
এখন পর্যন্তু পৃথিবীর বুকে যতো পাখি টিকে আছে তাদের মধ্যে প্রায় চল্লিশ
প্রজাতির পাখি আছে যারা উড়তে পারে না। নাম করতে গেলে এদের মধ্যে সবচেয়ে
বেশি পরিচিত পাখিগুলো হলো : উটপাখি, কিউই, পেঙ্গুইন, ইমু, মুরগী ইত্যাদি।
উড়তে পারে না বলেই ইংরেজীতে এদের বলে ফ্লাইটলেস বার্ড। যেসব পাখিরা উড়তে
পারে না এবং যারা পারে তাদের মধ্যে দুটি মৌলিক পার্থক্য আছে : প্রথমত:
উড়তে অক্ষম পাখিদের ডানার হাড়গুলো অপেক্ষাকৃত ছোট এবং দ্বিতীয়ত: উড়তে
সক্ষম পখিদের বুকের ঠিক মাঝের লম্বা হাড়ের উপরটা জাহাজের পাটাতনের মতো। ওই
পাটাতনের সাথেই আটকে থাকে শক্তিশালী পেশী, ওগুলো ওড়ার সময় পাখির ডানা
নাড়াতে সাহায্য করে। আর যারা উড়তে পারেনা তাদের বুকের ওই হাড়টি হয়
চ্যাপ্টা বা খুব সামান্য বাঁকানো।উড়তে না পারার ব্যাপারটিতে পাখিরা অভ্যস্ত হয় সাধারণত সেই সব দ্বীপাঞ্চলে যেখানে কোন ধরনের শিকারীর উৎপাত নেই। তাই বলে ভেবোনা, সব জাতের উড়তে অক্ষম পাখিদের দ্বীপাঞ্চলেই পাওয়া যায়। উট পাখিদের বাস পুর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার তৃণময় সমতলভূমিতে। উটপাখিরা উড়তে পারে না। তাই শত্রু দেখলে তারা অন্য ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ভয় দেখালে ওরা পায়ের থাবাকে ভয়ঙ্কর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আজ তোমরা জানবে এসব উড়তে অক্ষম পাখিদের এমনি নানা মজার তথ্য।
উটপাখির সাথে উটের অনেক মিল
অস্ট্রিচ হলো উটপাখি। উটের মতো লম্বা লম্বা পা বলেই হয়তো এদের নামটি এমন।
উড়তে না পারা পাখিদের মধ্যে সবার কাছেই কমবেশি পরিচিত এই পাখিটি তার বিশাল
আকৃতির জন্য। পৃথিবীতে টিকে থাকা সকল পাখীদের মধ্যে আকৃতিতে সবচেয়ে বড় হলো
উটপাখি। এখন কেবল পাওয়া যায় আফ্রিকায়। মাটি থেকে পাওয়া ফসিল অনুসন্ধান করে
অবশ্য দেখা গেছে এক সময় ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও এদের বসতি ছিল।পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ একটা উটপাখির উচ্চতা নয় ফুট (২.৭৩ মিটার) যার প্রায় অর্ধেকই হলো এদের ঘাড়। আর ওজন প্রায় ১৫০ কেজি (৩৩০ পাউন্ড)। মাদী পাখিগুলো এর থেকে সামান্য ছোট হয়। অস্ট্রিচ তার ডিমের জন্যেও বিখ্যাত। দৈর্ঘ্যে এটা প্রায় ৬ ইঞ্চি (বা ১৫০ মি.মিটার) আর প্রস্থ প্রায় ৫ ইঞ্চি (১২৫ মি.মিটার)। আর ওজন কত জানো কি? ১.৩৫ কেজি (৩ পাউন্ড)! বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিম কি আর সাধে বলে?
পুরুষগুলো সাধারণত সাদা কিন্তু ডানা ও লেজের দিকে সাদা পুচ্ছ থাকে। মাদি
উট পাখির ওজন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাদামী। হালকা নিচু করে রাখা মাথা থেকে
ঘাড়ের প্রায় পুরোটাই লালচে থেকে নীলচে রঙ দেখা যায়। পায়ের পুরোটাই খোলা,
পালকহীন। মাথাটা ছোট, ঠোঁট দুটো খাটো এবং খানিকটা প্রসারিত। এদেরকে একা, কখনো জোড়ায় জোড়ায় আবার কখনো বিশাল দল নিয়ে ঘুরতেও দেখা যায়। এটা আসলে নির্ভর করে ঋতুর উপর। এদেও লম্বা পাদুটো বেশ শক্তিশালি বিশেষ করে নখগুলো। ভীত সন্ত্রস্ত হলে এরা ঘন্টায় প্রায় ৭২.৫ কিমি বেগে দৌড়ায়। আর খুব বেশি কাছাকাছি হলে শত্রুর দিকে ভয়ঙ্কর লাথি ছুড়তে পারে।
লতাপাতা খেয়ে জীবনধারণ করলেও অনেক সময় পোকামাকড় খায় এরা। পানি ছাড়া দীর্ঘ দিন টিকতে পারে উটপাখি। উটের সঙ্গে উটপাখিদের এটাও একটা ভাল মিল বটে, তাই না?
নিউজিল্যান্ডের পাখি কিউই
কিউইদের বাস নিউজিল্যান্ডে। ধুসর বাদামী রঙের এই পাখিদের আকৃতি অনেকটা
মুরগির মতো। পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া পাখি মোয়াদের গোত্রের সাথে
এদের যোগাযোগ আছে। অনেক অর্থেই কিউইরা আসলে ব্যতিক্রমী। আগের বড় পাখার
যতটুকু এযুগে টিকে আছে (মাত্র দুই ইঞ্চি) তাও ঢাকা পড়ে থাকে তাদের পালকের
নিচে। একদম গোড়ার দিকে থাকার বদলে ওদের নাসারন্ধ্র থাকে লম্বা নমনীয়
ঠোঁটের আগ্রভাগে। আর সব পাখিদের পালকের মতো এদের পালকের গোড়ার দিকে লম্বা
হাতলের মতো থাকে না, এবং সেগুলো অনেক নরম ও চুলের মতো। পাগুলো বেশ
মোটাসোটা মজবুত ও পেশীবহুল। প্রত্যেক পায়ের চার আঙ্গুলে একটি করে বড় নখর
আছে। ছোট ছোট চোখগুলো দিনের আলোতে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনা। কানের
বাহিরের দিকটা বেশ বড় ও উন্নত। ঠোঁটের গোড়ার দিকটায় ছোট ছোট লোমের মতো
থাকে।এরা বসবাস করে বনের মধ্যে। গর্ত বা কুঠুরির মধ্যে ঢুকে ঘুমিয়ে থাকে দিনের বেলায়। আর পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, শুয়োপোকা ইত্যাদি খাবার খোঁজে বের হয় রাতের বেলা। প্রয়োজন কিউইরা বেশ জোরেই দৌড়াতে পারে। আর ফাঁদে পড়লে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ওদের থাবা।
গর্তের মধ্যে একটা বা দুটো ডিম পাড়ে কিউই। ডিমের রঙ সাদা। আশি দিন ধরে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায় সাধারণত পুরুষ কিউই পাখি। পর্যাপ্ত না থাকায় এদের প্রজাতি অনেকটাই হুমকির মুখে। নিউজিল্যান্ডে এদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জোর চেষ্টা চলছে।
কোট পড়া ভদ্রলোক পেঙ্গুইন
পেঙ্গুইনকে বলা হয় কালো কোট পড়া ভদ্রলোক। কারণটা নিশ্চয়ই জানো। সাদা
পৃথিবীতে ১৭ প্রজাতির উড়তে না পারা জলচর এই পাখিদের বসবাস কেবল দক্ষিণ
গোলার্ধে। এই ১৭ প্রজাতির অধিকাংশই কিন্তু অ্যান্টার্কটিকার বাইরে ৪৫ থেকে
৬০ ডিগ্রী অক্ষাংশে। সেখানে দ্বীপের মধ্যে তারা বাচ্চা পেঙ্গুইনের জন্ম
দেয় ও লালন-পালন করে। খুবই স্বল্প সংখ্যক পেঙ্গুইনের বসতি নাতিশীতোষ্ণ
অঞ্চলে আর গ্যালাপাগোস পেঙ্গুইন বাস করে বিষুব অঞ্চলে।দক্ষ সাঁতারু হয় পেঙ্গুইনরা। এদের দেহের আকৃতি অনেকটা পিপার (ব্যারেল) মতো হয় ফলে জলপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে অনায়াসে সাঁতার কাটতে পারে পেঙ্গুইন। তাদের রূপান্তরিত ডানা জোড়া পাতলা ও চ্যাপ্টা হওয়ায় সাঁতার কাটতে বেশ সুবিধা হয় এদের। অন্যান্য পাখিদের হাড়ের ভিতরটা যেমন ফাঁপা থাকে পেঙ্গুইনদের শরীরের হাড় কিন্তু তেমন নয়, একদম নিরেট ও নিশ্ছিদ্র। এটা তাদেরকে পানির নিচে ডুবে থাকতে সাহায্য করে। পানিতে যতো দক্ষ সাতারুই হোক না কেন ডাঙ্গায় এরা পাতিহাঁসের মতো হেলেদুলে চলতে হয় খাটো ও মোটা পাজোড়া শরীর থেকে বেশ অনেকটা পেছনে হওয়ায়। ডাঙ্গায় আসে ওরা কেবল ডিম দেবার জন্য, আসলে প্রকৃতপক্ষেই ওরা জলচর পাখি কেননা জীবনের ৮০ ভাগ সময়ই কাটে ওদের সমুদ্রে। ঠান্ডা পানির হাত থেকে দেহকে নিরাপদ রাখে এদেও ঘন ছোট পালক এবং চামড়ার নিচের পুরু চর্বির স্তর।
প্রজাতি ভেদে পেঙ্গুইনদের আকার-আকৃতিও হয় বিভিন্ন। ওজন ১.১ কেজি ও লম্বায় ১৬ ইঞ্চি হতে ৩০ কেজি ও ৪৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। প্রত্নত্বাত্তিক গবেষণা হতে দেখা যায়, ৩৭ মিলিয়ন থেকে ৪৫ মিলিয়ন বছর আগে ৬৬ ইঞ্চি উচ্চতার অর্থাৎ প্রায় মানুষের উচ্চতার পেঙ্গুইন হেঁটে বেড়াতো পৃথিবীর বুকে।
অস্ট্রেলিয়ার পাখি ইমু
উড়তে না পারা সব বড় আকৃতির পাখিদের এক নামে ইমু ডাকা হয়। অস্ট্রেলিয়ার
এদের আবাস ভূমি। এদের শরীরে এক বিশেষ ধরনের তেল পাওয়া যায়। আর এই তেলের
জন্য ইউরোপিয়ানরা ১৯ শতকে এদের ব্যাপকভাবে হত্যা করেছিল। বর্তমানে এদের
কেবল মাত্র একটি প্রজাতি টিকে আছে অস্ট্রেলিয়ায়। তাদের সংখ্যা প্রায় ৭০
হাজারের মতো। ইমু পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পাখি। গড়পড়তা উচ্চতা ৫ ফুট (১.৫
মিটার) এবং ওজন ৪৫ কিলোগ্রাম (১০০ পাউন্ড) এর বেশি। উড়তে অক্ষম এই
পাখিগুলো সামনে পেলে প্রায় যে কোন কিছুই গিলে ফেলে এবং সামান্য ভাল করে
দেখার জন্য তার দিকে তাকালেও তাড়া করে।তাদের অবিকশিত ডানা জোড়া লুকানো থাকে অবিন্যস্ত ও প্রায় চুলের মতো পালকের নিচে। পুচ্ছটি বাদামী, মাথা, ঘাড় ও পিঠের উপরের দিকের রঙ আরো ঘন এবং নীচের দিকে হালকা বাদামী। ঘাড় ও মাথার খোলা অংশ নীলচে ধূসর। ঠোঁট ও পা বাদামী রঙের হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বিস্তৃত সমতলভূমি ও ঝোপঝাড়ের মধ্যে ইমুদের বসতি। সেখানে তারা
ফলমূল, তৃণগুল্ম প্রভৃতি খাবার খেয়ে বাঁচে। পাখিটি খুবই শান্তিপ্রিয় ও
ভীতু স্বভাবের। আক্রমণকারীর হাত থেকে পালাতে ওরা দ্রুত দৌড়ে পালাতে পারে।
মাটিতে ছোট গর্ত বা খাঁজের মধ্যে এরা ঘন সবুজ রংয়ের প্রায় চার ইঞ্চি লম্বা
ডিম রেখে দেয়। তা দিয়ে ডিম ফুটে ছানা বের হতে সময় লাগে প্রায় দুই মাস, তা
দেয়ার পুরো দায়িত্বই কিন্তু নেয় পুরুষ ইমু। এমনকি বাচ্চা যত্ন-আত্তির
কাজটাও করে সে-ই।
আরও আছে...
শুধু এই পাখিগুলোই নয়, আরও বেশ কিছু পাখি আছে যারা উড়তে পারে না। সেরকম
কয়েকটির নামও জেনে রাখো। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রিয়া, ক্যাসোয়ারি, টিনামৌ। আরেকদিন এদের নিয়ে গপ্পো বলা যাবে।
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/তামিম আব্দুল্লাহ/এবি/এমআইআর/০৪ জুন








