ব্যাংগিটি!
‘হাঁস ছিলো সজারুও ব্যাকরণ মানি না হয়ে গেলো হাঁসজারু কেমনে তা জানি না’ তোমরা নিশ্চয়ই সুকুমার রায়ের সেই বিখ্যাত ‘আবোল তাবোল’ ছড়ার বইটা পড়েছো! সেখানে এই ছড়াটা আছে! অনেকে এধরণের ছড়াকে আবার ‘ননসেন্স রাইমস’ ও বলে!
কিন্তু আমরা কি আসলেই সব কিছুর অর্থ বুঝতে পারি! যেগুলোর অর্থ বুঝিনা সেগুলোর নামই কি ননসেন্স! আমার কিন্তু তা মনে হয় না! এবারের কিডজ এ কিন্তু তোমাদের জন্য থাকছে ব্যাঙ আর গিরগিটির নানা গল্প, তাই এই লেখাটার নাম দিয়েছি ব্যাঙ আর গিরগিটি মিলে ব্যাংগিটি! হাতে তো ছিলোই সুকুমার রায়ের হাঁসজারু। তাই এই লেখাটার নাম দিয়ে ফেললাম- ব্যাংগিটি!
যাক, ক’দিন আগের একটানা ঝমঝম বৃষ্টি দেখে বোঝা গেল, এখন আসলে বর্ষাকালই
চলছে। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, আমাদের দেশকে যে ষড়ঋতুর দেশ বলা হয়। ষড়ঋতু মানে
কিন্তু ছয়টি ঋতুর দেশ। একেকটা ঋতুর একেক রকম বৈশিষ্ট্য। এই যেমন, বর্ষার
বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বৃষ্টি-বাদল। একটানা চলবে বৃষ্টি, পথ ঘাট সব যাবে ডুবে,
বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবেনা। আর সেই সুযোগে স্কুলটাও কামাই করা যাবে
ইচ্ছামতো। কি মজার ঋতু তাই না!
আমরা যেমন বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করি, তেমনি আরেক ধরনের প্রাণী আছে, তারাও
বৃষ্টি পেলে খুব খুশি হয়। এতোই খুশি হয় যে, সারা বছর চুপচাপ থাকলেও বর্ষার
সময়েই গলা ছেড়ে গান ধরে। বুঝেছো, কাদের কথা বলছি? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছো,
ব্যাঙদের কথাই বলছি। ব্যাঙের আরেক নাম হচ্ছে দাদুরি। সেই যে একটা লেখায়
আছে- ‘দাদুরি ডাকিছে সঘনে! আবার আরেক নাম হচ্ছে ভেক! যাক গে, এখন চলো আজকে
তোমাদের ব্যাঙ জাতীয় কয়েকটি প্রাণীর সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দিই তাহলে।
ব্যাঙ কিন্তু একটা উভচর প্রাণী। উভচর মানে জানো তো? যারা কিনা পানিতে ও
ডাঙায়, (মানে জলে, স্থলে) এই দুই জায়গাতেই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারে,
ওদেরকেই বলা হয় উভচর। অন্যান্য প্রাণীর মতো উভচর প্রাণীদেরও আছে মেরুদন্ড।
যা কিনা তাদের স্বাভাবিকভাবে চলতে সাহায্য করে। তবে এরা অন্যান্য
মেরুদন্ডী প্রাণীর তুলনায় অনেক ধীর গতির। মানে, খুব একটা দ্রুত চলা ফেরা
করতে পারে না। তাছাড়া, খুব বেশি শক্তিশালীও নয় এরা, এমনকি কামড় দেওয়ার মতো
দাঁত বা খামচি দেওয়ার মতো শক্ত কোনো নখের কারবারও নেই এদের। আর তাই, এরা
অন্য প্রাণীদের শিকারেও পরিণত হয় সহজেই। তারপরও দেখো, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে
এরা ঠিকই কিন্তু টিকে যাচ্ছে পৃথিবীর বুকে।
এখন নিশ্চয়ই ভাবছো, এরা আত্মরক্ষা করে কিভাবে তাহলে! হুমম... ভাবনার কথাই
বটে! ঠিক আছে, যদিও এদের সাপের মতো বিষদাঁত কিংবা বাজপাখির মতো ধারালো নখ
নেই, তারপরও নানা উপায়ে এরা আত্মরক্ষা করে। এই যেমন, এদের শরীর হয় বেশ
খানিকটা ছোট; কিছুটা পিচ্ছিল ধরণের। কোনো কোনো প্রজাতি তো দিনের বেলায়
বেরই হয়না। অনেকেই হয়ে থাকে বর্ণচোরা। আর কিছু প্রজাতির পিঠে থাকে বিষাক্ত
থলে। এখান থেকে বিষ ছুঁড়ে দিয়ে ঘায়েল করতে পারে আক্রমণকারীকে।
এদের খাবার কিন্তু ছোট ছোট প্রাণী। ব্যাঙাচিগুলো (ব্যাঙের বাচ্চা) জন্মের
পর বেশ কিছুদিন লতা-পাতা, শ্যাওলা খেয়ে কাটালেও ধীরে ধীরে যখন বড়ো হতে
থাকে, তখন থেকেই ছোট ছোট প্রাণী খাওয়া শুরু করে। অনেক ব্যাঙাচি আবার নিজের
জাতভাইকেও খেয়ে ফেলে। এতে করে তারা অন্যদের থেকে আরো বেশি হৃষ্টপুষ্ট হয়ে
বেড়ে ওঠে।ভালো কথা, উভচর কিন্তু একটা গোত্রের নাম। প্রাণীজগতের ভাগের কথা জানো তো? ঐ যে, পর্ব-বর্গ-শ্রেণী-গোত্র-গণ-প্রজাতি... এভাবে যে ভাগ করা হয়েছে। এই ভাগের একটা গোত্রের নাম উভচর। এই গোত্রে ব্যাঙ আর ব্যাঙ জাতীয় প্রাণীদেরই প্রাধান্য বেশি। গিরগিটি ধরণের কিছু প্রাণীও আছে, তারাও অবশ্য এই গোত্রেরই অংশ।
আমাদের চারপাশে আমরা যতো ব্যাঙ দেখি, তার সবগুলোই কিন্তু আসলে ব্যাঙ নয়!
কিছু কিছু আছে ব্যাঙ আর কিছু আছে ব্যাঙ জাতীয় প্রাণী। যারা সত্যি সত্যি
ব্যাঙ (True Frogs), তাদের হয় লম্বা লম্বা পা আর মসৃণ ত্বক, কানের ছিদ্র
থাকে বেশ বড়ো। মুখটাও হয় লম্বাটে। আর যেগুলো ব্যাঙ জাতীয় (True Toads),
সেগুলোর ত্বক থাকে অমসৃণ, খসখসে, পা হয় ছোট ছোট, গোলগাল মুখ আর ভারী থলথলে
দেহ। কোনো Toad এর পিঠে থাকে সেই বিষাক্ত থলে। যেখান থেকে বিষ ছুঁড়ে দিতে
পারে ও শত্রুদের উদ্দেশে।এবার দেখো কোদাল পায়াকে (Spade foot Toad)। এরাও অন্য Toad গুলোর মতোই। খালি একটা পার্থক্য, এদের পিঠে বিষাক্ত থলিটা নেই আর পা গুলো হয় ঠিক কোদালের মতো! এদের চোখের মণি হয় আবার অনেকটা বিড়ালের মতো।
গেছো ব্যাঙের (Tree Frog) নাম শুনেছো তো? যারা কিনা গাছে গাছে ঘুরে বেড়ায়।
এদের শরীর হয় কিছুটা খাটো, তবে পাগুলি হয় অনেক লম্বা। বেশ উজ্জ্বল বর্ণের
হয়ে থাকে এরা। আর নিজের দেহের রঙও বদলাতে পারে এরা। আশেপাশের রঙের সঙ্গে
দেহের রঙ মিশিয়ে সহজেই লুকিয়ে থাকতে পারে।গ্রীষ্মমন্ডলীয় ব্যাঙদের (Tropical Frog) কথা আলাদা করে বলা প্রায় অসম্ভব। কারণ, এতো বিভিন্ন ধরণের প্রজাতি আছে এদের যে আলাদা বৈশিষ্ট্য বলা খুব কঠিন। শ’য়ে শ’য়ে আছে এই গ্রীষ্মমন্ডলীয় ব্যাঙ।
ছোট পা, সরু ও সুঁচালো মুখ কিন্তু প্রশস্ত কোমর, মসৃণ ত্বক আর মাথার পিছনের চামড়ায় হাল্কা ভাঁজ, এমন ধরণের ব্যাঙগুলো হলো সরু মুখো টোড (Narrow mouthed Toad)।
এবার শোনো গিরগিটির কথা। সাইরেনস (Sirens) নামে এক ধরনের গিরগিটি আছে।
এগুলো দেখতে প্রায় ঈল মাছের মতো। ফুলকোর ঠিক পেছনে একজোড়া ছোট্ট পা থাকে
এদের। এছাড়া আর কিছু নেই।উভচর গোত্রের সবচেয়ে বড়ো প্রাণী হলো ফুসফুসহীন গিরগিটি (Lungless Salamander)। দেখতে খানিকটা গুই সাপের মতো; লম্বা শরীর, ছোট ছোট পা। এদের আবার ফুসফুস নেই। ভাবছো দম নেয় কিকরে এগুলো! তাই, এরা শ্বাস নেয় ত্বকের মাধ্যমে।
তোমরা যদি এই প্রাণীগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে চাও, তাহলে পুকুর পাড়, ভিজে,
স্যাঁতসেতে জায়গাগুলো, কিংবা শ্যাওলাভরা পুকুর ও পুলগুলোকে বেছে নিতে
পারো। আর রাতের বেলা হলো এদেরকে দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কিন্তু সাবধান,
একা একা এভাবে যেন আবার পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে পড়ো না, সঙ্গে বড়ো কাউকে
অবশ্যই নেবে। আর ফ্ল্যাশ লাইট নিতে ভুলোনা। পর্যবেক্ষণ শেষে আবার যা যা
জেনেছো আজ, সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে ভুলোনা কিন্তু।বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/আশরাফুল ইসলাম সাগর/এইচআর/আগস্ট১৪/০৯








