‘আসলে আমি তো এখন ঢাকা শহরেই থাকি.......’ একান্ত সাক্ষাৎকারে নৌকা

: আরে নৌকা ভায়া, খুব তাড়াতাড়ি এসে পড়েছেন দেখছি।
: আসলে আমি তো এখন ঢাকা শহরেই থাকি। তাই তাড়াতাড়ি আসতে পারলাম আরকি।
: বলেন কি, আপনি ঢাকা শহরে কি করতে বসে আছেন?
: এখন তো আবার তোমাদের রাস্তাগুলো সবই ডুবে যায়। আর আমারও বেশ পসার বেড়ে যায়। গ্রামে তো আর অতো পয়সা নেই। মানুষকে বিশাল নদী কতো কষ্ট করে পার করে দিয়ে আর কয় টাকাই বা পাই। তারচেয়ে তোমাদের ঢাকায় মানুষগুলোকে এইটুকু পথ পার করে দিলেই তো অনেক টাকা পাওয়া যায়।
: টাকা তো আর আপনারা পান না, পায় তো মাঝি।
: মাঝির টাকাই তো আমাদের টাকা। মাঝির টাকা হলেই তো আমাদের গায়ে নতুন ছই লাগে, আমরা গায়ে আলকাতরা মেখে সাজগোজ করতে পারি। আমাদের মাঝিরা যেমন আমাদের ভালোবাসে, আমরাও তেমনি মাঝিদের ভালোবাসি।
: বলেন কি? আপনাদের কি গায়ে আলকাতরা মাখতে ভালো লাগে?
: তা লাগবে কেনো? আলকাতরা মাখতে তো আমাদের খুবই ভালো লাগে। কখনো দেখোনি, আমাদের আলকাতরা মাখানোর পর আমরা রোদের মধ্যে কি সুন্দর হাসতে হাসতে থাকি! আমাদের যে তখন কি খুশি লাগে!
: মাঝিরা বুঝি বুঝতে পারে যে আপনারা আলকাতরা মাখতে খুব পছন্দ করেন?
: ঠিক তা নয়। আসলে আমাদেরকে আলকাতরা মাখানো হয় যাতে আমাদের খোলের ভেতর পানি না ঢুকতে পারে। তা না হলে দুইটা কাঠের তক্তার মাঝের জোড়া দিয়ে পানি ঢুকে তো আমরা নদী আর বিলের মাঝখানে গিয়েই ডুবে যেতাম। তাতে আর তোমাদেরকে নদী পার হতে হতো না।
: প্রাচীনকাল থেকেই মানুষকে নদী পার হতে সাহায্য করছেন আপনারা। ঠিক কবে প্রথম আপনারা এ কাজ করতে শুরু করলেন বলতে পারবেন?
: তা প্রায় যীশু খ্রীস্টের জন্মেরও তিন-চার হাজার বছর আগে থেকে। তখনো পৃথিবীর সব জাতি আমাদের ব্যবহার করতে শিখেনি। তবে এই উপমহাদেশের মানুষেরা অবশ্য প্রথম থেকেই আমাদের ব্যবহার করতে শুরু করে দিয়েছিলো।
: সেসময়ের কোনো নৌকা এখনো আছে নাকি?
: হ্যাঁ, তা কয়েকটা আছে। সবচে পুরোনো যে নৌকাটা পাওয়া গেছে তা প্রায় দশ হাজার বছরের পুরোনো। তবে সেটা ছিলো অনেকটা ভেলার মতোই।
: তাহলে তো সেটাকে একরকম ভেলাই বলা যায়। সবচেয়ে পুরোনো নৌকার মতো দেখতে নৌকা কোনটা?
: সবচেয়ে পুরোনো নৌকার মতো দেখতে যে নৌকাটা পাওয়া গেছে সেটা এখন আছে নেদারল্যান্ডের এসেন শহরের ড্রেন্টস মিউজিয়ামে। নৌকাটা তৈরি করা হয়েছিলো খ্রীস্টের জন্মেরও ৮০০০ কি ৭০০০ বছর আগে।
: সেই নৌকাটা কি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিলো? তখন তো আর কাঠ জোড়া দেবার ব্যবস্থা ছিলো না।
: না, ঠিক কাঠ দিয়ে বানানো হয়নি সেটা। এক ধরনের পাইনাস গাছের গুড়ি দিয়ে নৌকাটা বানানো হয়েছিলো। এর ভিতরের সব কিছু ফেলে দিয়ে তাকে বানানো হয়েছিলো। কোনো জোড়া ছিলো না।
: বেশ তো!
: তখনকার আরো একটা নৌকা পাওয়া গেছে, কুয়েতে। প্রায় ৭০০০ বছরের পুরোনো এই নৌকাতে করে নাকি তখনকার মানুষ সমুদ্রেও যেতো। এটা বানানোর জন্য লম্বা গাছের গুড়ি ব্যবহার করা হয়েছিলো। আর সেটাতে নাকি আলকাতরাও লাগানো ছিলো।
: আমরাও তো তখন নৌকা ব্যবহার করতাম, তাই না?
: তা তো করতেই। বাংলাদেশে যতো নদী-নালা আর খালবিল আছে, নৌকা ছাড়া কি আর এখানে চলার কোনো উপায় আছে? নৌকা ছাড়া তখনই বা মানুষ চলতো কিভাবে বলো?
: আচ্ছা, আমাদের দেশে কয় ধরনের নৌকা আছে বলতে পারেন?
: কমপক্ষে ১৫০ ধরনের নৌকা তো আছেই। যেমন ধরো ছোট্ট-ছোট্ট ছিপ, ডিঙি, কোষা, পানসি, আবার বিরাট বিরাট বজরা, গয়না, সাম্পান, রপ্তানি, আরো কতো নামের সুন্দর সুন্দর নৌকা আমাদের বাংলাদেশে আছে! কিন্তু দুঃখের বিষয় কি জানো, এগুলোর অনেকগুলোই কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে।
: আসলেই তো খুব দুঃখের খবর শোনালেন নৌকা ভায়া।
: সব নৌকাই কিন্তু মূলত দুই প্রকার। এক প্রকারের নৌকার মাথায় গলুই থাকে। আর পিছে নৌকার দিক ঠিক রাখার জন্য থাকে হাল। এগুলো সাধারণত খুব স্রোত আছে এমন নদীতে চালানো হয়। এগুলোকে বাইনকাটা নৌকাও বলা হয়। যেমন ধরো কর্ণফুলী নদীতে যে সাম্পান চালানো হয় সেগুলো এই ধরনের নৌকা।
: আর এক ধরনের নৌকায় বুঝি গলুই, হাল কিছুই থাকে না?
: না। এই যেমন আমার কথাই ধরো। আমি এক সাধারণ ডিঙি নৌকা, আমার কোনো গলুইও নেই, কোনো হালও নেই। আমাকে নিয়ে তুমি যদি কোনো খরস্রোতা নদীতে যাও, তুমি তো তালই সামলাতে পারবে না। স্রোত যে তোমাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তুমি ঠাহরই করতে পারবে না।
: আপনারা তো কাঠের তৈরি। কোন কাঠ দিয়ে আপনাদেরকে বানানো হয়?
: সেটা তো নৌকাটা কোন অঞ্চলের তার উপরও নির্ভর করে। কারণ সব কাঠ তো আর সব জায়গায় পাওয়া যায় না। আবার কোনো কোনো জায়গায় কিছু কিছু কাঠ অনেক বেশি পাওয়া যায়। যেমন সুন্দরবনে তো সুন্দরী কাঠের অভাবই নেই। তাই ওখানে সুন্দরী কাঠ দিয়ে নৌকা বানানো হয়।
: শুধু সুন্দরী কাঠ দিয়েই নৌকা বানানো হয়? আর কোনো কাঠ দিয়ে নৌকা হয় না বুঝি?
: কেনো হবে না? আমাদের দেশেই তো আরো অনেক কাঠ দিয়ে নৌকা বানানো হয়। যেমন ধরো জারুল, শাল, বার্মা টিক বা সেগুন কাঠ দিয়েও নৌকা বানানো হয়।
: তো নৌকা ভায়া, আজকের মতো আমরা ইন্টারভিউটা এখানেই শেষ করছি। আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বিদায়।
:
এখন আসলেই আমি মহাব্যস্ত। বিশেষ করে ঢাকা শহরের জন্য। যাই হোক, বিদায়। আর কিডজের বন্ধুরা, তোমরা কিন্তু নৌকায় উঠে সাবধানে থাকবে, অভ্যাস না থাকলে বেশি নড়াচড়া করলে নদীতে পরেও যেতে পারো। তখন কিন্তু ভিজে গিয়ে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। আজকে তাহলে বিদায়। তোমরা যেদিন আমার পিঠে চড়ে বিশাল নদী পারি দেবে সেদিন আবার দেখা হবে।
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/নাবীল/এসএ/এইচআর/আগস্ট ১২/১০


























































