sakkhatkar

বই

ফেব্রুয়ারি মাসে কি হয় বলো তো? ঠিক বলেছো, ফেব্রুয়ারি মাস মানেই অমর একুশে বইমেলা। আর একুশে বইমেলা মানেই আব্বু-আম্মুকে পটিয়ে গাদা গাদা বই কেনা। তো সেই বইমেলার মাসে আমরা চিন্তা করলাম, যাক এবার নাহয় তোমাদের জন্য একটা বইয়ের সাক্ষাৎকারই নিয়ে নেয়া যাক। কিন্তু চাইলেই কি আর বইমেলার মাঝে কোনো বই সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য সময় বের করতে পারে, বলো! অনেক চেষ্টা করে তবেই একটা বইয়ের কাছ থেকে একটু সময় পাওয়া গেলো। তবে সেই বইটা আবার তোমাদের জন্য লেখা কোনো হাসিখুশি বই না, গম্ভীর একটা ইতিহাসের বই। আর তাই তার সাক্ষাৎকারটাও হয়ে গেলো ইতিহাসের একটা গম্ভীর ক্লাশ। আমি তো খালি মাথা চুলকাচ্ছি, আর চিন্তা করছি কি করা যায়। আমার ভাবসাব দেখে বই ভায়া আমাকে জিজ্ঞেসই করে ফেল্লো- কি সমস্যা। আর আমিও বললাম, আমি তো সাক্ষাৎকার নিচ্ছি তোমাদের জন্য, সেখানে কি আর বুড়োদের ভাষায় কথা বললে হয়। শুনে বই ভায়া বললো, ওহ, এই কথা! ঠিক আছে, আবার নাও সাক্ষাৎকার, এবারে আমি কিডজের ক্ষুদে বন্ধুদের জন্য সব আবারো বলছি। ব্যস, হয়ে গেলো তোমাদের জন্য একটা জম্পেশ সাক্ষাৎকার। অনেক গল্প হলো, এবারে চলো, আমরা সাক্ষাৎকারটা শুনে আসি।

: : বই ভায়া, কেমন আছেন?

: : ভালোও, আবার খারাপ। দুটোই।

: : দুটোই মানে? ভালো থাকলে আবার কেউ খারাপ থাকে নাকি?

: : আসলে আমি একটা কারণে ভালো আছি, আরেকটা কারণে খারাপ আছি। ভালো আছি, কারণ এখন ফেব্রুয়ারি মাস। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে চলছে অমর একুশে বইমেলা। আর এই মেলা যতদিন চলে, ততোদিন সব বই-ই ভালো থাকে। মেলার দিনগুলো তো আমাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো উৎসব।

: : তাহলে আবার খারাপ আছেন কেন?

: : কারণ আমাকে যে বেশি বেশি কেউ কিনছে না! আমাদের দেশে আসলে কেউই সহজে ইতিহাসের বই কিনতে চায় না। অথচ ইতিহাসের বই থেকে কতো মজার মজার জিনিসই জানার আছে! কে কবে পৃথিবীর কোথায় কখন কি করেছিলো, সব তুমি জানতে পারবে। অতীতের কতো কিছু ভেসে উঠবে তোমার চোখের সামনে, ভাবতেই তো ভালো লাগে।

: : এটা তো আসলেই খুব খারাপ কথা। ইতিহাসের বই তো সবারই পড়া উচিত। সব বাবা-মায়েদের উচিত, তাদের ছেলেমেয়েদেরকে ইতিহাসের বই কিনে দেয়া।

: : তুমি ঠিকই বলেছো। কিন্তু বাবা-মা’রা তো আর তা বোঝেন না। তারা শুধু বাচ্চাদের কমিকস কিনে দেন। কমিকসের পাশাপাশি ইতিহাসের বই পড়া-ও যে কতো মজার হতে পারে, এটা তাদের মাথাতেই আসে না।

: : আচ্ছা, আপনি তো ইতিহাস বিষয়ে অনেক কিছুই জানেন, তাই না?

: : তা জানি না আবার! আমি ইতিহাসের বই, আমি ইতিহাস সম্পর্কে জানবো না তো জানবে কে? বলো, ইতিহাসের কি জানতে চাও- বাংলার প্রথম নবাব কে ছিলেন, মিশরের কোন পিরামিডের নিচে কার কবর, রাশিয়ার জারের পতন কিভাবে হলো, ক্ষুদিরাম ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে পরতে কোন গান গাইছিলেন, সবই আমি তুড়ি মেরে বলে দিতে পারি।

: : না না, ওসব আপনার বলতে হবে না। আপনি বরং আজকে আমাদেরকে বই সম্পর্কেই  বলুন।

: : বই সম্পর্কে  বলবো? আচ্ছা ঠিক আছে, তাই বলি। বই কতোগুলো কাগজ বা চামড়ার পাতা একসঙ্গে জড়ো করে তৈরি করা হয়। পাতাগুলো লেখা, আঁকা, নকশা করা, এমনকি খালিও হতে পারে। আর এখন তো ইলেক্ট্রনিক বই-ও বের করা হচ্ছে, যেগুলো কম্পিউটারে পড়া যায়, সংরক্ষণ করা যায়, এমনকি ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠানোও যায়। এগুলোকে বলে ই-বুক বা ইলেক্ট্রনিক বুক।

: : বই ভায়া, বই কাকে বলে সেটা না বলে আপনি বরং আমাদেরকে বইয়ের ইতিহাস নিয়ে বলেন, ওটা শুনতেই বেশি মজা।

: : আচ্ছা, তবে বইয়ের ইতিহাসই না হয় শোনো। প্রথম লেখার কৌশল আবিষ্কার করেছিল মিশরীয়রা, প্রায় ৫ হাজার বছর আগে। কিন্তু তখনো তো আর কাগজ আবিষ্কার হয়নি, তাই তখন লেখা হতো গাছের বাকলে, কাঁদা মাটিতে, পাথরে কিংবা বিভিন্ন ধাতুর তৈরি জিনিসপত্রের গায়ে খোদাই করে।

: : মিশরীয়রাই না কাগজ আবিষ্কার করেছিলো?

: : না, ওরা ঠিক কাগজ আবিষ্কার করেনি। তবে যেটা আবিষ্কার করেছিলো, ওটা দিয়েই প্রাচীনকালে কাগজের কাজ করা হতো। ওরা আবিষ্কার করেছিলো প্যাপিরাস।

: : প্যাপিরাসটা আবার কি?

: : প্যাপিরাস নীলনদের তীরের একরকম গাছ। এই গাছের পাতা পিটিয়ে-শুকিয়ে লেখার উপযোগী করে তোলা হতো। আর তারপর তাতে লেখা হতো। তবে প্যাপিরাসে মিশরীয়রা যখন লিখতো, তখন তারা একটা মজার কাজ করতো।

: : কি সেই মজার কাজ?

: : সেসময় ওরা দাড়ি-কমা-সেমিকোলন কিছুই ব্যবহার করতো না। শুধু তাই না, মিশরীয়রা লেখার সময় কোন দিক দিয়ে শুরু করতো, আর কোনদিকে শেষ করতো, সেটা বোঝাই ছিলো দায়। কেউ লিখতো বাম থেকে ডানে তো কেউ লিখতো ডান থেকে বামে। আবার কেউ কেউ ছিলো এককাঠি বেশি সরেস। ওরা করতো কি, এক লাইন বাম থেকে ডানে লিখতো তো পরের লাইন লিখতো ডান থেকে বামে।

: : বলেন কি? এ তো বিরাট সমস্যা!

: : তা তো বটেই। এমনি যে সব বই ওরা লিখেছিলো, তার মধ্যে যেটাকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই হিসেবে ধরা হয়, সেটি কিসের বই জানো? সেটা একটা হিসাবের বই!

: : হিসাবের বই?

: : হ্যাঁ, মিশরের রাজা কাকাইয়ের হিসাব বই। এই বইটি প্রকাশিত হয় সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ সালে। তখনকার বইগুলোর আকৃতি অবশ্য এখনকার বইগুলোর আকৃতির মতো ছিলো না। সে সময়ের বইগুলোর আকৃতি ছিল স্ক্রোলের মতো।

: : স্ক্রোলের মতো মানে?

: : পুরোনো দিনের সিনেমাতে দেখায় না, এক রাজা আরেক রাজার কাছে কেমন একটা কাঠিতে প্যাঁচানো কাগজে চিঠি পাঠাতো, ওই আকৃতিটাকেই বলা হয় স্ক্রোল আকৃতি। আগেকার বইগুলোতে প্যাপিরাসগুলোকে একটার সঙ্গে আরেকটা জুড়ে দিয়ে ওরকম স্ক্রোলের আকৃতি দেয়া হতো।

: : তাহলে বইগুলো এখনকার আকৃতি পেলো কিভাবে?

: : এখনকার বইয়ের যে আকৃতি, সেটাকে বলা হয় কোডেক্স। এই আকৃতি প্রথম ব্যবহৃত হয় রোমে। কিন্তু প্রথম প্রথম রোমানরাই এই আকৃতির বই গ্রহণ করেনি। সবাই ওই স্ক্রোল আকৃতির বই-ই পছন্দ করছিলো। পরে একসময় সবাই বুঝতে পারলো কোডেক্স আকৃতির বই-ই সুবিধাজনক।

: : কেন এই বইগুলো বেশি সুবিধাজনক?

: : এই আকৃতির বইগুলো পড়া সহজ, বহন করা সহজ, লুকানো সহজ। আবার বইয়ের ভেতর থেকে  কোনো কিছু খুঁজতে চাইলে স্ক্রোল আকৃতির বই হলে  তোমার সেটা খুঁজে পেতে কতোক্ষণ লাগবে সেটা একবার চিন্তা করে দেখো! আর কোডেক্স আকৃতির বইয়ে তো পৃষ্ঠা আলাদা আলাদা করাই আছে, খালি পৃষ্ঠা নাম্বার জানলেই হয়। আরো সুবিধা আছে, স্ক্রোল আকৃতিতে প্যাপিরাসের দুইপাশ ব্যবহার করা যেতো না, একপাশেই কেবল টানা লেখা হতো। আর কোডেক্স পদ্ধতিতে দুইপাশেই লেখা যায়। ফলে কাগজ লাগে কম।

: : এই পদ্ধতির দেখছি অনেক সুবিধা। তো বই ভায়া, অনেকই তো কথা হলো। বইয়ের ইতিহাসের গল্প হলো অনেক। আজকের মতো আমরা সাক্ষাৎকারটা এখানেই শেষ করি, কি বলেন?

: : সেটাই। তোমার সাক্ষাৎকারের মাঝে কতোজন না জানি আমাকে না পেয়ে ঘুরে গেছে কে জানে! এমনিই আমার বিক্রি-বাট্টা কম। অবশ্য কিডজের বইয়ের পোকাদের জন্য সাক্ষাৎকারটা দিতে ভালোই লেগেছে। বিদায়, বন্ধুরা, বিদায়।

: : আপনাকেও বিদায় বই ভায়া।

: বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/নাবীল/সাগর/এইচআর/ফেব্রূয়ারি ৭/১১